চলমান এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন ঘিরে এক চরম দায়িত্বহীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে। নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও বিপুলসংখ্যক পরীক্ষক খাতা সংগ্রহ করতে না আসায় সময়মতো ফলাফল প্রকাশ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে কড়া হুশিয়ারি দিয়ে জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। তবে বোর্ডের এই কঠোর অবস্থানের পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূল্যায়ন শেষ করে সঠিক সময়ে নিখুঁত ফলাফল প্রকাশ করা যাবে কিনা, তা নিয়ে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে।বাংলা প্রথম পত্রের ক্ষেত্রে ২৩৫ জন পরীক্ষকের অনুপস্থিতি পুরো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ই-টিআইএফভুক্ত (ইলেকট্রনিক টিচার ইনফরমেশন ফর্ম) শিক্ষকদের মোবাইলে আগেই এসএমএস পাঠিয়ে খাতা নেওয়ার তারিখ জানানো হয়েছিল। এরপরও তারা খাতা নেননি। বোর্ড শেষ সুযোগ হিসেবে গতকাল ৫ মে বেলা ১১টার মধ্যে খাতা সংগ্রহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। অন্যথায় চরম প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নজরদারির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মূল্যায়নে বিলম্বের বহুমুখী প্রভাব : চল্লিশ বছরের শিক্ষকতা
জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ধানমন্ডি আইডিয়াল স্কুলের সাবেক অধ্যক্ষ মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সময়াবদ্ধ একটি কাজে শুরুতে এমন বড় ধরনের ধাক্কা বা বিলম্ব কেবল ফলাফল প্রকাশের তারিখকেই পেছায় না, বরং এর একটি মারাত্মক চেইন রিঅ্যাকশন বা বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর।একধিক পরীক্ষার্থী জানান, তারা বোর্ডের সম্পর্কে সোশ্যাল মিডিয়ায় জানতে পেরেছেন। তাদের মতে, পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর প্রতিটি দিন পরীক্ষার্থীকে তীব্র মানসিক চাপের মধ্যে পার করতে হয়। ফল প্রকাশে বিলম্ব হলে এই অনিশ্চয়তা ও মানসিক উদ্বেগ দীর্ঘায়িত হয়, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় ক্ষতি।আর অভিভাবকরা বলছেন, ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ মূল্যায়নের ঝুঁকি থাকবে। কারণ, খাতা সংগ্রহ করতে দেরি করায় পরীক্ষকরা উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম সময় পাবেন। তাড়াহুড়া করে খাতা দেখতে গিয়ে মূল্যায়নে মারাত্মক ভুলত্রুটি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা একজন শিক্ষার্থীর জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পরীক্ষকদের পেশাদারত্বের অভাব ও নৈতিকতার অবক্ষয় স্পষ্ট। তিনি বলেন, শিক্ষকতা কেবলই চাকরি নয়, এটি একটি ব্রত। পরীক্ষার খাতা দেখার মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অবহেলা করা চরম অনৈতিক কাজ। পরীক্ষার খাতা সময়মতো মূল্যায়ন না হলে পুরো শিক্ষাপঞ্জি ভেঙে পড়ে। শিক্ষকরা যদি দায়িত্ব এড়িয়ে চলেন, তবে শিক্ষার্থীদের আমরা কী বার্তা দিচ্ছি? বোর্ডের উচিত শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ বা সাময়িক শাস্তি নয়, বরং স্থায়ীভাবে এসব শিক্ষকদের কালো তালিকাভুক্ত করা এবং তাদের এমপিও বা পদোন্নতি বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।সাবেক বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, খাতা মূল্যায়নে তাড়াহুড়া করলে ভুল বাড়বে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার্থীরা। তিনি বলেন, বোর্ড কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে খাতা সংগ্রহ করাবে ঠিকই, কিন্তু মূল সংকটটা তৈরি হবে খাতা মূল্যায়নে। ২৫ দিনের কাজ যখন ১০ দিনে করতে বাধ্য করা হবে, তখন শিক্ষকরা খাতা ভালো করে না পড়েই নম্বর বসিয়ে দেবেন। এতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হবে আর খাতা পুনর্নিরীক্ষণের (বোর্ড চ্যালেঞ্জ) সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাবে। বছরের পর বছর শিক্ষকরা খাতা নিতে গড়িমসি করেন সম্মানী কম হওয়ার অজুহাতে। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।এদিকে নোটিশে বর্তমান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার উল্লেখ করেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও খাতা নেননি, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কারণ দর্শাতে বলা হবে। তবে পরীক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করতে চাই, আমরা কোনো অবস্থাতেই ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হতে দেব না।