হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা জাহাজগুলোকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে প্রজেক্ট ফ্রিডম নামে অভিযান ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যের সময় অনুযায়ী গতকাল সোমবার সকালে এ অভিযান শুরু হওয়ার কথা। এ নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরান বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে। পরে হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি জাহাজে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে ইরান। অবশ্য ওয়াশিংটন এ হামলার কথা অস্বীকার করেছে। দুটি তেলের ট্যাঙ্কারেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে ওয়েলপ্রাইস ডটকম জানায়, গতকাল সোমবার সকালে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি জাহাজে ইরানের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবরে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ২ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়ে যায়। এতে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১১১ দশমিক ১২ ডলারে পৌঁছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার সতর্ক করার পরও তারা তা অমান্য করে। মার্কিন নৌযানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
গতকাল সংযুক্ত আরব আমিরাত দাবি করেছে, ইরান তাদের ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে তাদের একটি তেল স্থাপনা ফুজেইরাহতে আগুন ধরে যায়। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে তারা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকিয়েছে। আলজাজিরা জানায়, এ নিয়ে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য আসেনি। এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন কাতারের আমির। তিনি আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। নিন্দা জানিয়েছে জর্ডানও।এ অবস্থায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক কিমিট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত উপসাগরীয় অঞ্চল ছেড়ে আসা এবং ওই অঞ্চলের দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেওয়া।প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা জাহাজগুলো মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করেছে। এসব দেশকে তিনি সংঘাতময় পরিস্থিতিতে কেবল নিরপেক্ষ ও নিরীহ দর্শক! বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাদের জাহাজগুলোকে এ সীমাবদ্ধ জলপথ থেকে নিরাপদে বের করে আনবে। ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেন, এ জাহাজ চলাচলের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সেসব ব্যক্তি, সংস্থা ও দেশগুলোকে মুক্ত করা, যারা কোনো ভুল করেনি তারা পরিস্থিতির শিকার। পরে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, হরমুজ নিয়ে ইরান যদি বাধার সৃষ্টি করে, তবে দেশটিকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হবে। তিনি বলেন, আগের চেয়ে এখন আমাদের অনেক বেশি অস্ত্র ও বিস্ফোরক রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে সপরিবারে হত্যা করে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র। একই দিনে মিনাব শহরে স্কুলে বোমা ফেলে দেড় শতাধিক শিশুকে হত্যা করা হয়। এর পরই পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হলে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের ২০ শতাংশ এ প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দামে গুরুতর প্রভাব পড়ে। এর জেরে ব্যাপক বেড়ে যায় জ্বালানি তেলের দাম। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের স্পিরিট এয়ারলাইন্সের সেবা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে স্বল্প আয়ের মার্কিনিরা সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন; বেকার হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার মানুষ।কার্যত হরমুজ প্রণালি ট্রাম্পের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, যুদ্ধের কারণে আনুমানিক দুই হাজার জাহাজ হরমুজে আটকা পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধের দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ট্রাম্পের প্রজেক্ট ফ্রিডম বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। এতে যোগ দেবে ১৫ হাজার সেনা; থাকবে ক্ষেপণাস্ত্রবিধ্বংসী ডেস্ট্রয়ার ও শতাধিক যুদ্ধবিমান। সেন্টকম বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্য মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ৪ মে থেকে প্রজেক্ট ফ্রিডমে সহায়তা দেওয়া শুরু করবে।
আলজাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের পদক্ষেপের বিষয়ে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছে ইরান। ইরানের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক ও আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম আজিজি গতকাল বলেন, বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বাহিনীর যে কোনো হস্তক্ষেপকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে দেখবে তেহরান। এর আগে ইব্রাহিম আজিজি বিবিসি তেহরানকে বলেন, এটি (হরমুজ) আমাদের মৌলিক অধিকার। এ পথ দিয়ে কী হবে, সে সিদ্ধান্ত ইরানের। এ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।