→ ঢাকার আকাশ মেঘলা থাকবে, বৃষ্টি নিয়ে যা জানা গেল→ সংবিধান সব ধর্মাবলম্বীর নিরাপত্তা দিতে বাধ্য: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী→ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, অফিস খোলা আজ→ দুর্গাপূজা-লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে আখাউড়া স্থলবন্দর সাত দিন বন্ধ→ অফিসার্স ক্লাব থেকে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের মরদেহ উদ্ধার
No icon

গডফাদারে’র খোঁজে নেমেছে পুলিশ

অপরাধের গডফাদারের তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন নেত্রকোনার দুর্গাপুরের সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। এর আগেই তাঁকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করল দুর্বৃত্তরা। এ দুটি ঘটনার যোগসাজশ আছে কিনা, খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সেই গডফাদারসহ জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। তবে গতকাল শুক্রবার রাত ১০টা পর্যন্ত এ ঘটনায় জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।   

অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ আলিফ হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের শিগগির শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের দাবিতে ময়মনসিংহে মানববন্ধন করেছেন গণমাধ্যমকর্মীরা।
এদিকে জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে গতকাল আলিফ ফকিরের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কর্মকর্তা শ্রদ্ধানন্দ নাথ জানিয়েছেন, দুর্বৃত্তরা আলিফকে ছয়টি গুলি করেছিল। পাঁচটি গুলি তাঁর শরীর ভেদ করে বের হয়ে যায়। মরদেহে আটকে থাকা অন্য গুলিটি বের করা হয়েছে।   

গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর পৌরসভার তেলনজিয়া বাজারে দুই দুর্বৃত্ত আলিফ ফকিরকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলা টেলিভিশনের নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে নানা অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লিখতেন এবং ভিডিও প্রকাশ করতেন। 

আলিফ ফকিরের বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের চারুলিয়া মাইজপাড়া গ্রামে। তবে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকতেন তেলনজিয়া গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে। ওই বাড়ির অদূরেই ছিল সেই চায়ের দোকান। সেখান থেকে ফেরার পথে দুর্বৃত্তরা তাঁকে অনুসরণ করে। এক পর্যায়ে গুলি করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। 
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ওই দুই হামলাকারীর বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছর। তবে তাদের এই গ্রামে আর দেখা যায়নি। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, সাংবাদিক আলিফ ফকির বরাবরই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ‘নেত্রকোনায় রোহিঙ্গাদের গডফাদার বাবুল’ নামে একটি ভিডিও পোস্ট দেন তাঁর পেজে। এর ভিউ ৫০ হাজারের বেশি। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় তিনি চোরাচালানসহ নানা অপরাধের চিত্র তুলে ধরেন। এসব কারণে দুর্বৃত্তদের কোপানলে পড়েন।
সাংবাদিক আলিফকে এর আগেও হত্যাচেষ্টা করা হয়। দুর্বৃত্তরা গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় তাঁকে কুপিয়ে জখম করেছিল। এবার তাঁকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হলো। 

ফেসবুকে তাঁর শেষ লেখা
‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ ফেসবুক পেজে গত বুধবার আলিফ ফকির লেখেন, ‘আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য-প্রমাণ ...’। কিন্তু সেই গডফাদারের মুখোশ উন্মোচন করা আর হলো না। স্বজনরা বলছেন, এই পোস্টের জেরে আলিফকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। যদিও তিনি অনেক আগে থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ছিলেন। আগেও হামলার শিকার হয়েছেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে কারও সঙ্গে তাঁর শত্রুতা ছিল না। 

আলিফ কোনো সাংবাদিক সমিতির সদস্য ছিলেন না বা প্রচলিত গণমাধ্যমেও যুক্ত ছিলেন না। তবে স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিলেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলাভাবে লিখতেন। এ জন্য তাঁকে একজন সাহসী মানুষ হিসেবে দেখতেন স্থানীয় সাংবাদিকদের অনেকে। 
জানা গেছে, আলিফ ফকির একসময় সামরিক বাহিনীতে সৈনিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে তিনি অবসরে গিয়েছিলেন, নাকি চাকরি ছেড়ে এসেছিলেন বা চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন কিনা, তা নিশ্চিত জানা যায়নি।

গতকাল রাতে জানতে চাইলে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ সমকালকে বলেন, ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কেন এই সাংবাদিককে হত্যা করা হলো এবং এতে কারা জড়িত, তা তদন্ত করছে পুলিশের একাধিক ইউনিট। কথিত সেই গডফাদারকে শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ময়নাতদন্ত শেষে গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে গতকাল সন্ধ্যায় আলিফ ফকিরের মরদেহ দাফন করা হয়েছে। মামলার প্রক্রিয়া চলছে।

ময়মনসিংহে মানববন্ধন
আলিফ ফকির হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের শিগগির গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল সকালে ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের সামনে ‘সাধারণ সাংবাদিকবৃন্দ’-এর ব্যানারে মানববন্ধন করা হয়েছে। এতে জেলার বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের শীর্ষ নেতা, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সর্বস্তরের সংবাদকর্মীরা অংশ নেন।

বক্তারা বলেন, একজন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করার ঘটনা অত্যন্ত নৃশংস ও উদ্বেগজনক। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র কিংবা প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন রয়েছে কিনা, তা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করতে হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে মূল অপরাধী ও পরিকল্পনাকারীদের গ্রেপ্তার করতে হবে। 

সাংবাদিকদের সুরক্ষার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা আরও বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতন বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় দেশজুড়ে সাংবাদিক সমাজ কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।

কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক ইউনিয়ন ময়মনসিংহের সভাপতি এম আইয়ুব আলী, ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম, টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অমিত রায়, টেলিভিশন রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি বাবুল হোসেন, নিউজ চ্যানেল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুনুর রশিদ এবং সাধারণ সম্পাদক এ এস এম হোসাইন শাহীদসহ বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা।

২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করার দাবি
আলিফ ফকির হত্যার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার এবং ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের নেতারা। তা না হলে সারাদেশের সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ করে নেত্রকোনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। 
গতকাল বিকেলে বাংলাদেশ সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের চেয়ারম্যান ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের সম্পাদক মো. খায়রুল আলম রফিক এসব দাবি জানান। এ সময় সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের পরিচালক (আইন ও মানবাধিকার) আলী আবিদ, ময়মনসিংহ অঞ্চলের সংগঠনের প্রধান বিলাল হোসেন মানিক, কেন্দ্রীয় ফাউন্ডেশনের নেতা জামাল উদ্দিন, ময়মনসিংহ জেলা প্রস্তাবিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামসহ সংগঠনের অন্য নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।