রাজধানী ঢাকার উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রতিটি এলাকায়ই মশার অত্যাচারে অতিষ্ঠ মানুষ। সন্ধ্যার আগে দরজা-জানালা বন্ধ করেও মশার হাত থেকে নিস্তার মিলছে না। কিউলেক্স মশার উৎপাতে ঘরে-বাইরে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। ঘরে লেখাপড়া, খাওয়া-দাওয়া, রান্না-বান্নাসহ কোনো কিছুই স্বস্তির সঙ্গে করার উপায় নেই। একই অবস্থা অফিসে, দোকানপাটে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমন কি গণপরিবহনেও। বিশেষ করে বিকাল থেকে ট্রাফিক সিগনালে গাড়ি দাঁড়ালেই দুই হাত দিয়ে মশা তাড়ানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়েন যাত্রীরা। এই পরিস্থিতির মধ্যেই এডিস মশার বিস্তার জনমনে নতুন করে ডেঙ্গু আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। গত প্রায় দুই বছর জনপ্রতিনিধিহীন ঢাকার দুই সিটি কর্তৃপক্ষের মশক নিধন কার্যক্রমে গা-ছাড়া ভাবের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে থেকে ব্যাপক হারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না থাকলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ অবস্থায় এখন থেকেই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এ বছর ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
জানা গেছে, ঈদের আগে এবং পরে একাধিকবার বৃষ্টি হওয়াতে কিউলেক্স মশার উপদ্রব কিছুটা কমার আশা করা হচ্ছে। কিন্তু নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে এডিস মশা। বর্ষা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা। গবেষকদের মতে, মার্চের শুরুতে এডিস মশার ঘনত্ব যা ছিল এপ্রিলের শুরুতে তার দ্বিগুণ হয়েছে। এখন থেকেই এডিসের উৎপত্তিস্থলগুলো ধ্বংস করতে না পারলে সামনের দিনগুলোতে ডেঙ্গু মোকাবিলা দুরূহ হয়ে উঠবে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবে নগর কর্তৃপক্ষ মনে করে বর্ষা শুরু হওয়াতে এডিস মশার প্রাদুর্ভাব বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও এখন পর্যন্ত শঙ্কিত হওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছেনি। এডিস মশার ভয়াবহতা চিন্তা করে দুই সিটি করপোরেশন বিশেষ কর্মসূচি নিয়েছে।
গবেষকদের মতে, গত বছর জন্ম নেওয়া এডিসের ডিমগুলো বৃষ্টির পানি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ এডিস মশায় পরিণত হয়েছে। এই এডিস মশা এখন নতুন করে ডিম ছাড়তে শুরু করেছে। মশার জীবনচক্র অনুযায়ী একটি পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হওয়ার পর ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে ডিম ছাড়ার সক্ষমতা রাখে এডিস মশা। তাই বর্তমানে যেসব পূর্ণাঙ্গ এডিস মশা দেখা যাচ্ছে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ডেঙ্গু মোকাবিলা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ঈদের ছুটিতে হওয়া ভারী বর্ষণের পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে। তার মতে, বৃষ্টির পানি বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকায় এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। এসব স্থির পানিতে মশা ডিম পাড়ে এবং সেখান থেকেই দ্রুত ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটে।
এডিস ও কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বছরব্যাপী কর্মসূচি পালন করে। দুই সিটির স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালনায় মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম বা বিশেষ অভিযানের নামে মাঠে নামলেও মশার উপদ্রব সহনীয় পর্যায়ে নামাতে ব্যার্থ হয়েছে। তাদের মতে, শুধু সিটি করপোরেশনের একারে পক্ষে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই সম্ভব না। তবে ঢাকার বাসিন্দাদের দাবি, মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যমে যখন মশা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, তখনই সিটি করপোরেশন নড়েচড়ে বসে। অন্য সময় সিটি করপোরেশনের মশককর্মীদের খুব বেশি দেখা যায় না। তাদের প্রশ্ন এত কাজ করলেও মশার ঘনত্ব কেন কমছে না।