এস আলম গ্রুপের হাতে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ থাকার সময় ব্যাংকটিতে ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মী নিয়োগ হয়েছে। এদের মধ্যে কোনো ধরনের বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়া কেবল জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি জমা নিয়ে আট হাজার ৫৪২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগ এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া এবং গ্রুপের আসাদগঞ্জ অফিসে রাখা বাক্সে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন।বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ এবং আগস্টে সরকার পতনের পর ছাঁটাই প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কিনা, তা যাচাইয়ের জন্য চলতি বছরের এপ্রিলে গঠিত কমিটি এই প্রতিবেদন দেয়।বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফুজ্জামানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। সাধারণত বিভিন্ন ব্যাংকে পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালিত হয় যুগ্ম পরিচালকের নেতৃত্বে।মূল্যায়ন পরীক্ষার পর ছাঁটাই হওয়া কর্মী এবং ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিদর্শন প্রতিবেদনে কোনো সুপারিশ না করে শুধু ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, কর্মী নিয়োগ এবং ছাঁটাই দুটিই ব্যাংকের নিজস্ব বিষয়। ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব কর্মী নিয়োগ দিয়েছিল। তারাই ছাঁটাই করেছে। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা সমীচীন হবে না।পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের মোট কর্মী ছিল ২১ হাজার ৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ হাজার ৮৩২ জন। কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই শুধু প্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে আট হাজার ৫৪২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলার আট হাজার ৯৯ জন। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ছিল পাঁচ হাজার ১৪৮ জন।প্রতিবেদনে বলা হয়, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাড়ি ও আসাদগঞ্জের অফিসে জীবনবৃত্তান্ত জমার বাক্স থাকত। এসব বাক্সে লেখা থাকত পটিয়া জেনারেল, পটিয়া ক্যাশ, পুরুষ জেনারেল-সাতকানিয়া-লোহাগাড়া, পুরুষ ক্যাশ-গণ্ডামারা-বাঁশখালী, সনাতন জেনারেল, মহিলা ক্যাশ, পিয়ন-ডিপ্লোমা, পুরুষ জেনারেল, পুরুষ ক্যাশ ইত্যাদি।
সলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, যে কোনো পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থীদের থেকে আবেদন আহ্বান করে অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। এরপর যোগ্য প্রার্থীদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিতে হবে। পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ মার্কসকে ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।পরিদর্শন প্রতিবেদনে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া কোন পদে কতজন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। ব্যাংকটি মোট ২৭টি পদে এসব নিয়োগ দেয়। এর মধ্যে পরীক্ষা ছাড়া সর্বোচ্চ দুই হাজার ৭৮৯ জন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) ও দুই হাজার ১৬০ ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়। এর বাইরে মেসেঞ্জার কাম গার্ড এক হাজার ৫৪৪ জন এবং রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিম (আরডিএস) প্রকল্পের স্টাফ হিসেবে ৯১৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ৫০১ জন ট্রেইনি জুনিয়র অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়।ওই সময়ে উচ্চপদের মধ্যে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া দুজন এমডি, আটজন ডিএমডি, দুজন এসইভিপি, ব্যাংকটির ট্রেইনিং ইনস্টিটিউটের জন্য একজন প্রিন্সিপাল নিয়োগ হয়। আর পাঁচজন ইভিপির মধ্যে চারজনকে নিয়োগ দেওয়া হয় বিজ্ঞপ্তি ছাড়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ডিএমডি হতে হলে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং পূর্ববর্তী পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতা লাগবে। এ নিয়ম লঙ্ঘন করে এস আলমের পিএস আকিজ উদ্দিনকে মাত্র আট বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা এবং মিফতাহ উদ্দীনকে ১৭ বছর অভিজ্ঞতায় ডিএমডি নিয়োগ দেওয়া হয়।ছাঁটাইয়ের বিষয়ে যা আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শন ও চারটি বহির্নিরীক্ষকের বিশেষ নিরীক্ষায় ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট সময়কালের নিয়োগে অনিয়ম চিহ্নিত হয়। ফলে ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়াদের যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ। মূল্যায়ন পরীক্ষা বন্ধের জন্য দুই কর্মী ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট হাইকোর্টে একটি রিট করেন।বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ওই বছরের ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেন আদালত। ২৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষা নিতে বাধা নেই বলে জানানো হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামী ব্যাংক মূল্যায়ন পরীক্ষার আয়োজন করে। প্রাথমিকভাবে সেখানে পাঁচ হাজার ৩৭৩ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে অংশগ্রহণকারী ৪০২ জনের সবাই চাকরিতে বহাল আছেন। চার হাজার ৯৭১ জন কর্মকর্তা পরীক্ষা দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। বিভিন্ন কারণে মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারাদেরও ২৮৭ জনকে পরবর্তী সময়ে আবার যুক্ত করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্ষদের সিদ্ধান্তে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ চার হাজার ৬৮৫ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এদের মধ্যে চার হাজার ৪৪০ জনের বাড়ি চট্টগ্রামে। ১৫৫ জনের বাড়ি কক্সবাজার, ঢাকার ১০ জন এবং বাকি ৬১ জেলার ছিলেন ৮০ জন।এর বাইরে পাঁচজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগে ১২১ জন, চুক্তির মেয়াদপূর্তিতে নবায়ন না করায় এক হাজার ১৯০ জন এবং অন্যান্য কারণে ১৩৬ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন সমকালকে বলেন, সব ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নিয়োগ পাওয়াদের জন্য গত বছর একটি মূল্যায়ন পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। পরীক্ষায় যারা অংশ নেয়নি, শুরুতে তাদের ওএসডি করা হয়। পরবর্তী সময়ে সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ছাঁটাই করা হয়।