রোহিঙ্গা থেকে অর্থনীতি: জাতিসংঘে প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রীর ১০ কর্মসূচিপ্রাথমিকের ১৪ হাজার শিক্ষকের জন্য বড় সুখবর, অক্টোবরেই যোগদানবৃষ্টি-তাপমাত্রা নিয়ে নতুন তথ্যতুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক, কী আলোচনা হলোপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ
No icon

জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়েও বিকল্প ছিল

এক লাফে ২০ টাকা বাড়ায় এক লিটার ডিজেল কিনতে এখন লাগছে ১৩৫ টাকা। কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ এবং অকটেনের দাম ঠেকেছে ১৬৫ টাকায়। দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম এখন সর্বোচ্চ। ডিজেল-পেট্রোলের এই দাম বাড়ার প্রভাব শুধু গাড়ির জ্বালানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ভাড়া থেকে শুরু করে কৃষির সেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহন প্রায় সব খাতেই এর ধাক্কা লাগে। সব মিলিয়ে এর কারণে বাড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়।জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, এটি বাস্তবতা। পাশাপাশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসানের হিসাবও রয়েছে। কিন্তু সেই চাপ সামাল দিতে একবারে ভোক্তার ওপর ২০ টাকা দাম বাড়ানোই কি একমাত্র পথ ছিল? তাদের মতে, বছরের পর বছর বিপিসির অর্জিত মুনাফার একটি অংশ দিয়ে আপৎকালীন তহবিল করা গেলে এবং সংকটের সময়ে কর-শুল্ক কিছুটা কমানো গেলে দাম বাড়ানোর চাপ অনেকটাই কমানো যেত।বিপিসির আর্থিক হিসাবেও রয়েছে বড় অঙ্কের মুনাফার চিত্র। গত ১১ বছরে সংস্থাটি প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। কোনো কোনো বছর মুনাফা ছাড়িয়েছে ৭ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন সময়ে বিপুল অর্থ ব্যাংকে জমা ছিল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেই মুনাফার অর্থ দিয়ে আপৎকালীন তহবিল গড়ে তোলার উদ্যোগ দেখা যায়নি।সরকার অবশ্য বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দাম সমন্বয় করা ছাড়া বিকল্প ছিল সীমিত। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম, জাহাজ ভাড়া ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে তেল বিক্রি হওয়ায় সীমান্ত দিয়ে পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। এসব কারণে বিপিসির বড় অঙ্কের লোকসান হচ্ছে। তাই আগের দামে জ্বালানি তেল বিক্রি অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কতটা

দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন। এর মধ্যে বিপিসি আমদানি করে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজেদের প্রয়োজনে ফার্নেস অয়েল আমদানি করে। বিপিসি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল আমদানি করে। বাকি বড় অংশ আসে পরিশোধিত জ্বালানি তেল হিসেবে। সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় ডিজেল। মোট সরবরাহের দুই-তৃতীয়াংশ এই জ্বালানি। বিপিসির বেশি মুনাফা আসে অকটেন, পেট্রোল ও জেট ফুয়েল বিক্রি থেকে।দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৫৮ শতাংশ যায় পরিবহন খাতে। বিদ্যুতে ১৮, কৃষিতে ১৫, শিল্পে ৬ এবং গৃহস্থালিতে ১ শতাংশ ব্যবহার হয়। অন্যান্য খাতে যায় আরও ২ শতাংশ। এই হিসাবই বলে দেয়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে কেন এর প্রভাব দ্রুত পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

এক লিটার ডিজেলে আসলে কত খরচ

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১৮০ থেকে ১৮২ ডলার। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রিমিয়াম অর্থাৎ জাহাজ ভাড়া, বীমা ও অন্যান্য আমদানি খরচ। ব্যারেলপ্রতি এসব খরচ ছিল সাড়ে ১১ থেকে ১২ ডলার।এই হিসাবে প্রতি লিটার ডিজেলের আন্তর্জাতিক মূল্য পড়ে প্রায় ১৪২ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভ্যাট-ট্যাক্স। ২৫ শতাংশ হিসাবে কর-শুল্কের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা। এরপর দেশের ভেতরের পরিবহন, বন্দর চার্জ, এজেন্ট কমিশন, পাম্প মালিকদের কমিশনে ২৭ থেকে ২৮ টাকা খরচ হয়।সব মিলিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে এক লিটার ডিজেল পৌঁছাতে খরচ হয় ২০৪ থেকে ২০৫ টাকা। কিন্তু নতুন দামে তা বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়। অর্থাৎ বিপিসির হিসাবে প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান থাকছে।
তবে খাত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, বাস্তবে বর্তমান দামে ডিজেলে বিপিসির লোকসান প্রতি লিটারে প্রায় ৫০ টাকা।বিপিসির দেওয়া আন্তর্জাতিক মূল্যের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জ্বালানি বিভাগের এক সাবেক কর্মকর্তা। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো একটি দিনের সর্বোচ্চ দাম ধরে দেশে তেলের প্রকৃত ক্রয়মূল্য হিসাব করা যুক্তিসংগত নয়।তিনি বলেন, সারা বছরের জন্য জ্বালানি তেলের দরপত্র হয় দুই দফায় জানুয়ারি থেকে জুন এবং জুলাই থেকে ডিসেম্বর। দরপত্রে মূলত প্রিমিয়াম, জাহাজ ভাড়া, বীমা ও কমিশনের মতো খরচ নির্ধারিত হয়।

এরপর মাসভিত্তিক জাহাজে করে তেল দেশে আসে।তেলের আন্তর্জাতিক দাম নির্ধারণে ব্যবহার করা হয় সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্ল্যাটস সূচক। সংশ্লিষ্ট জাহাজে তেল ওঠার আগের দিন, জাহাজীকরণের দিন এবং জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার দিন এই তিন দিনের প্ল্যাটস দর বিবেচনায় নিয়ে গড় মূল্য নির্ধারণ করা হয়।অর্থাৎ একটি জাহাজে যে তেল আসছে, তার দাম নির্ধারণে শুধু সংকটের দিনের আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনা করা হয় না। নির্দিষ্ট সময়ের আন্তর্জাতিক সূচক অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া রয়েছে।ওই কর্মকর্তা বলেন, মোট আমদানির প্রায় অর্ধেক আসে জিটুজি চুক্তি এবং বাকিটা দরপত্রের মাধ্যমে। জিটুজি ব্যবস্থায় প্রিমিয়াম বা জাহাজ ভাড়াও প্রতিবছর আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই আগের দিনের পুরো মূল্যবৃদ্ধি তাৎক্ষণিকভাবে দেশের বাজারে প্রতিফলিত হবে, এমনটা বলা যায় না।তাঁর প্রশ্ন, দাম বাড়ানোর সময় ব্যারেলপ্রতি ১৮০ থেকে ১৮২ ডলারের হিসাব সামনে আনা হচ্ছে। সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হুতিদের হামলার পর দাম ওই পর্যায়ে উঠেছে। অথচ এর আগে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দাম ছিল প্রায় ১৫০ ডলার।

কর কমালে কি চাপ কমত

জ্বালানি তেলের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কর-শুল্কের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। খাত-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ২৫ শতাংশ কর-শুল্ক যুক্ত হচ্ছে, যার পরিমাণ ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা। তাদের মতে, সংকটের সময়ে এই করের হার সাময়িকভাবে ১০ থেকে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা গেলে ভোক্তার ওপর পুরো আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ দেওয়া লাগত না।তাদের যুক্তি, কর-শুল্কের একটি অংশ সরকার সাময়িকভাবে ছাড় দিলে রাজস্ব কমবে ঠিকই। কিন্তু এর বিনিময়ে পরিবহন, কৃষি ও পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপরও কিছুটা চাপ কমতে পারে।

কর পদ্ধতিতে খরচ বেড়েছে

জ্বালানি তেলে আগে বিপিসি কর-শুল্ক দিত ট্যারিফ ভ্যালুতে। ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকার বিপিসিকে কর-শুল্ক দিতে বাধ্য করেছে ইনভয়েজ ভ্যালুতে। এতে তেলের দাম বাড়লে কর-শুল্কও বাড়ে। প্রতি লিটার তেলে এখন ২৫ শতাংশ কর-শুল্ক ধরলে ৩৫-৩৮ টাকা পরিশোধ করতে হয়। ট্যারিফ ভ্যালুতে এটা প্রায় নির্ধারিত ছিল।