বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী ভারত এবং মিয়ানমার। দেড় বছর ধরে এ দুই প্রতিবেশীর সঙ্গেই সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে বাংলাদেশের।মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে মানবিক আশ্রয় নিয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এই বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাতে কোনো সাফল্য আসেনি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের পর রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে জোর উদ্যোগের কথা শোনা যায়। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের তৎপরতাও লক্ষ করা যায়। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উল্টো রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপর চাপ বেড়েছে।
গত বছর আগস্টে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সংলাপের আয়োজন করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে যোগ দেন। এতে মিয়ানমার ও আঞ্চলিক স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন এবং বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথ প্রচেষ্টার আহ্বান জানানো হয়। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা কেবল কথার জালে বন্দি থাকতে পারি না। এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও। সংকটের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে ভাবা এবং তা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখা সবার যৌথ দায়িত্ব। একই সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গারা যে নিজেদের মাতৃভূমি মিয়ানমারের রাখাইনে ফিরতে চায়, সে কথা তুলে ধরে তাদের প্রত্যাবাসনের পথ খুঁজে বের করার অঙ্গীকার জানায় পশ্চিমা বিশ্বের ১১ দেশ। রোহিঙ্গা সংকটের আট বছরপূর্তিতে গত বছরের আগস্টে ঢাকায় দেশগুলোর মিশন এক যৌথ বিবৃতিতে এ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকারও প্রতিশ্রুতি দেয়।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে গত বছর তিনটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়। এসব সম্মেলনের আয়োজক জাতিসংঘ, কাতার ও বাংলাদেশ। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল বাড়াতে এবং তাদের রাখাইনে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক প্রয়াস জোরদার করতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আট বছর পর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন বৈশ্বিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসবের ফলাফল শূন্য। গত বছরের ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে অংশীজন সংলাপ : রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে আলোচনার জন্য প্রাপ্ত বার্তা শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে অনুষ্ঠিত হয় রোহিঙ্গাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন। আর কাতারের দোহায় ৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় রোহিঙ্গাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। কিন্তু এসব সম্মেলনে শুধু আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি ছাড়া আর কিছুই হয়নি। রোহিঙ্গারা এখন বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সামাজিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতায় মাদক ও রোহিঙ্গা ইস্যু এখন আর বিচ্ছিন্ন দুটি বিষয় নয়; বরং ক্রমেই তা একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে যুক্ত হয়ে উঠছে। মাদক চোরাচালান, সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সংকট ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে এ দুটি ইস্যু দেশের জন্য বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ধরন ও বিস্তৃতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইয়াবা, হেরোইন, আইস ও সিনথেটিক ড্রাগের সহজলভ্যতা সমাজের সর্বস্তরে নীরব ধ্বংস ডেকে আনছে। বিশেষ করে তরুণ ও কিশোর সমাজ মাদকের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে, আর কক্সবাজার-টেকনাফ এলাকা এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এখানেই রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে মাদকের যোগসূত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালের পর থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হলেও এর অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শরণার্থী শিবিরগুলোর আশপাশে অপরাধমূলক তৎপরতা, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক বাণিজ্যের বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই উঠে আসছে। যদিও সব রোহিঙ্গাকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা অন্যায় ও অমানবিক, তবু কিছু সংঘবদ্ধ চক্র যে এই অসহায় জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করে মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, তা বাস্তবতা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।