পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে অর্থের জোগানদাতা কারা, তা শনাক্ত করতে আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান জোরদার করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ লক্ষ্যে ১১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশের ছয়টি বড় পোশাকশিল্প গ্রুপের ৫১টি প্রতিষ্ঠান। তালিকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক, পরিচালক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের নামও রয়েছে। কয়েকজনের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।অসন্তোষ, সংঘাত ও ভাঙচুরের ঘটনায় অর্থের উৎস এবং এর পেছনে কারা রয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় শ্রমিক আন্দোলন ও সংঘাতের সময় অর্থের জোগান দেওয়ার অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি সরাসরি নগদ অর্থ লেনদেনের তথ্যও অনুসন্ধান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও ফেসবুকের মাধ্যমে আন্দোলন ঘিরে প্রচার ও সমন্বয়ের অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে।
তবে একযোগে সব ব্যাংক হিসাব জব্দ না করে প্রথমে লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে এনবিআর। সংশ্লিষ্ট কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে যেন জটিলতা তৈরি না হয়, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে অর্থের উৎস, লেনদেনের ধরন ও গন্তব্য যাচাইয়ের পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তালিকায় আরও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত হতে পারে।এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কয়েকটি সরকারি সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংক হিসাব শনাক্ত ও জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের বিবরণ চাওয়া হয়েছে। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পোশাক খাতে অস্থিরতা সৃষ্টির মতো কর্মকা-ে অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।এনবিআরের তালিকায় ছয়টি ব্যবসায়ী গ্রুপের অধীন ৫১টি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তালিকায় মন্ডল গ্রুপের ২৮টি, গিভেনসী গ্রুপের পাঁচটি, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের তিনটি, নিপা গ্রুপের তিনটি, ওয়েল গ্রুপের তিনটি এবং তুসুকা গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
মন্ডল গ্রুপের ২৮টি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক হিসাব তলবের তালিকায় রয়েছে। এগুলো হলো- মন্ডল ইন্টিমেটস লিমিটেড, কটন ফিল্ড (বিডি) লিমিটেড, কটন ক্লাব (বিডি) লিমিটেড, কটন ক্লোথিং (বিডি) লিমিটেড, মন্ডল ফ্যাব্রিকস লিমিটেড, ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেড, মার্ক সোয়েটার লিমিটেড, মন ট্রিমস লিমিটেড, মন্ডল স্পিনিং মিলস লিমিটেড, মন্ডল ফার্মিং অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং লিমিটেড (পূর্বনাম : মন্ডল অটো ব্রিকস লিমিটেড), আলিম নিট (বিডি) লিমিটেড, মন্ডল সিকিউরিটিজ লিমিটেড, অ্যাপোলো ফ্যাশন লিমিটেড, ট্রিমস ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেড, ইকো ইন্টিমেটস লিমিটেড, নূর চেকস অ্যান্ড স্ট্রাইপস লিমিটেড, অ্যাপোলো নিটওয়্যার (বিডি) লিমিটেড, অ্যাপোলো প্যাকেজিং (বিডি) লিমিটেড, কটন ক্লাউট (বিডি) লিমিটেড, নিটেক্স ড্রেসেস লিমিটেড, এমব্রেলা লিমিটেড, মন্ডল অ্যান্ড কোং লিমিটেড, মন্ডল নিট কম্পোজিট লিমিটেড, মন্ডল নিটওয়্যারস লিমিটেড, মন্ডল ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড, মন্টেক্স ফ্যাব্রিকস লিমিটেড, পানামা এগ্রো কমপ্লেক্স লিমিটেড এবং জিগজ্যাগ স্টুডিও (বিডি) লিমিটেড।গ্রুপটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে তালিকায় রয়েছেন আব্দুল আলিম মন্ডল, তারিন তাসলিমা, মো. জুবায়ের মন্ডল, মোসা. সুলতানা খাতুন, মাসুদা খাতুন, হাজী আব্দুল মান্নান মন্ডল, মোমেনা খাতুন, আব্দুল মোমিন মন্ডল, মাহমুদুল হাসান, জান্নাতুল ফেরদৌস, আসাদুর রহমান সিকদার, গোলাম ফারুক তালুকদার, মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, সুরভী রহমান, শেরিন সুলতানা, তাসলিমা আক্তার, খন্দকার ফারুক কায়সার, নাহিদ খন্দকার এবং হাজী আব্দুল মজিদ মন্ডল।
তলবের তালিকায় থাকা গিভেনসী গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো- গিভেনসী গার্মেন্টস লিমিটেড, গিভেনসী স্পিনিং মিলস লিমিটেড (পূর্বনাম : গিভেনসী স্পিনিং মিলস লিমিটেড), গিভেনসী গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড, গিভেনসী ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড এবং গিভেন্স ফুডস অ্যান্ড এসেনশিয়ালস লিমিটেড (পূর্বনাম : গিভেনসী ফুডস লিমিটেড)। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে তালিকায় রয়েছেন- খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল, মাসুমা খাতুন লিপা, মিসেস মাহমুদা খাতুন এবং খতিব আব্দুল হাদী।স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের অধীন তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে তলবের তালিকায়। এগুলো হলো- স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড-সাগর ইনফো বিল্ডার্স লিমিটেড জেভি এবং দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন হোসনে আরা বেগম, ইঞ্জিনিয়ার মো. আতিকুর রহমান, মাহমুদা বেগম, ইঞ্জিনিয়ার একেএম মোশাররফ হোসেন, তাসমিয়া রহমান, হাসনাত মোশাররফ, ফারিয়া রহমান, ফাহিম মোশাররফ এবং হাসিব মোশাররফ।নিপা গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো মেসার্স নিপা নিট ওয়্যার কোম্পানি, সেলিনা অ্যাপারেলস লিমিটেড এবং নিপা ফ্যাশন ওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে তালিকায় রয়েছেন- সানজিদ চৌধুরী, মো. খসরু চৌধুরী, এম. মুনিরুল ইসলাম এবং মো. টিপু সুলতান।