ঢাকায় বজ্রসহ বৃষ্টির আভাসজ্বালানি সংকটে কয়লায় ভরসাশিগগির চালু হচ্ছে না বাংলাদেশ-ভারতের যাত্রীবাহী ট্রেনএসএসসির খাতা পুনর্মূল্যায়ন, ফলাফলে বড় পরিবর্তন, ৩০৭৯ জিপিএ ৫এসএসসির পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশ আজ, এবার হবে খাতা পুনর্মূল্যায়ন
No icon

জ্বালানি সংকটে কয়লায় ভরসা

জ্বালানি সংকট, আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার মধ্যে ফের কয়লার ওপর ভরসা বাড়াচ্ছে সরকার। গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি, এলএনজি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং জ্বালানি তেলের তুলনামূলক বেশি উৎপাদন ব্যয়ের কারণে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দেশীয় কয়লাকে কাজে লাগানোর নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আমদানি করা কয়লার ব্যবহার বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখার উদ্যোগও রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনায় আগামী ১০ বছরে দেশের বিভিন্ন কয়লাক্ষেত্র থেকে ৫৬৫ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এর মধ্যে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি সম্প্রসারণ করে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ১৬ কোটি টন কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা রয়েছে। খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছে দিতে রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে; প্রয়োজনে নতুন রেল সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে কয়লা আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামোগত সুবিধা থাকায় মাতারবাড়ীতে আরও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চিন্তাও করছে সরকার।

দেশের মাটির নিচে বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী, খালাশপীর, জামালগঞ্জ ও দীঘিপাড়াসহ পাঁচটি প্রধান কয়লাক্ষেত্রে প্রায় ৮ বিলিয়ন টন কয়লার মজুদ বা সম্পদের কথা বিভিন্ন সরকারি নথি ও গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে এর পুরোটা অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে উত্তোলনযোগ্য নয়। বর্তমানে বড়পুকুরিয়া ছাড়া অন্য কোনো কয়লাক্ষেত্র থেকে বড় পরিসরে বাণিজ্যিক উত্তোলন শুরু হয়নি। ফলে বিপুল দেশীয় কয়লা মাটির নিচে পড়ে থাকলেও বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে আমদানি করা কয়লার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট, পরিবহন ব্যয় কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিলে সেই নির্ভরতা বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ঝুঁকি তৈরি করছে।সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এরপর ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে বড়পুকুরিয়া থেকেই প্রায় ১৬ কোটি টন কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনায় উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে কয়লানীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কয়লার মজুদ থাকলেই হবে না; অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য মজুদ, উত্তোলন প্রযুক্তি, পরিবেশগত প্রভাব, পানি ব্যবস্থাপনা, পুনর্বাসন এবং উত্তোলিত কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার অবকাঠামো সবকিছুর সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।বর্তমানে দেশে ৮টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা এখন প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। তবে কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায়ই রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো না কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকছে। এ ছাড়া কয়লা সংকটে সক্ষমতা অনুযায়ী সব সময় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুরোদমে চালানো যাচ্ছে না। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার তিনটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। ফলে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উত্তোলিত কয়লা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুদ হয়ে পাহাড় জমে থাকছে। দেশীয় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ছাড়াও ভারতের ঝাড়খণ্ডে নির্মিত আদানির কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়।

বর্তমানে দেশে বাণিজ্যিকভাবে চালু বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, মহেশখালীর মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট। এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের বেশি। এ ছাড়া পটুয়াখালীতে আরপিসিএল নরিনকো কোম্পানির আরও একটি ১২শ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে।বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ৫২৫ মেগাওয়াট, পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট, রামপাল ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট এবং মাতারবাড়ী কেন্দ্রের সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টের সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। আরও রয়েছে আরপিসিএলের ১২শ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অংশ এখন আর ছোট নয়। বরং গ্যাসের সংকট, এলএনজি আমদানির অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে তুলনামূলক স্থিতিশীল বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উৎপাদন খরচে কয়লার সুবিধা

বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচের সবচেয়ে বড় অংশের একটি হলো জ্বালানি ব্যয়। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ক্ষেত্রে দেশি গ্যাসের মূল্য তুলনামূলক কম হলেও গ্যাসের সরবরাহ সংকট বড় সমস্যা। এলএনজি আমদানি করে গ্যাসের ঘাটতি পূরণ করতে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। একইভাবে ফার্নেস অয়েল বা ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় আরও বেশি।কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জ্বালানি ব্যয় কেন্দ্রভেদে ভিন্ন। কয়লার আন্তর্জাতিক মূল্য, কয়লার মান, পরিবহন ও হ্যান্ডলিং ব্যয়, ডলার বিনিময় হার এবং কেন্দ্রের দক্ষতার ওপর এ ব্যয় নির্ভর করে। সামগ্রিকভাবে আমদানি করা কয়লা দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎও অনেক ক্ষেত্রে তেলভিত্তিক উৎপাদনের চেয়ে কম ব্যয়বহুল। আর দেশি কয়লা ব্যবহার করা গেলে আমদানি, জাহাজভাড়া ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কয়লার দাম কম হলেই পুরো বিদ্যুতের দাম কম হবে না। কেন্দ্র নির্মাণের মূলধনী ব্যয়, ঋণের সুদ, সক্ষমতা বা ক্যাপাসিটি চার্জ, কয়লা পরিবহন, বন্দরের খরচ এবং পরিচালন ব্যয়ও বিদ্যুতের মোট ব্যয়ে যুক্ত হয়। ফলে কেন্দ্রভেদে প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের যথাযথ তুলনা করা প্রয়োজন।