দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের পরপরই মন্ত্রিসভায় আরও দেড় ডজন নতুন মুখ যুক্ত হতে যাচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে বিএনপি ও জনপ্রশাসনে। সেক্ষেত্রে রদবদল নয়, বরং নতুন ও অভিজ্ঞ নেতাকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত। মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার নেপথ্য কারণ সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনা এবং কাজের মূল্যায়ন নিশ্চিত করার তাগিদ। বিএনপি ও জনপ্রশাসন সূত্রে এমনটাই জানা গেছে।সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, দলীয় পরিসরে ত্যাগী ও দীর্ঘদিন ধরে মূল্যায়নবঞ্চিত সিনিয়র নেতাদের মধ্য থেকে নতুন মুখ এনে মন্ত্রিসভার কলেবর ও কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সিনিয়র ও অভিজ্ঞদের পূর্ণাঙ্গমন্ত্রণালয়ে এবং নবীনদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যুক্ত করা হতে পারে। মূলত বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে একই ব্যক্তির বহুমুখী দায়িত্ব থাকায় কাজে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। এ উপলব্ধি থেকেই স্বরাষ্ট্র, কৃষি, ধর্ম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১২টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। নির্বাচনের পাঁচ দিন পর, ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়। তার ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ২৪ জন মন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। সেই হিসাবে গত ১৬ আগস্ট পূর্ণ হয় এই সরকারের ছয় মাস।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়ার আলোচনায় থাকা সম্ভাব্য দেড় ডজন নামের তালিকায় বিভিন্ন কোটা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদধারীদের মধ্য থেকে নতুন করে টেকনোক্র্যাট বা সংসদ সদস্য কোটায় যুক্ত হওয়ার আলোচনা রয়েছে। সরকারের শরিক বা মিত্র দলগুলো থেকে দুইজন নেতার নামও সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে। এ ছাড়া বিগত সময়ে রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত ও নির্যাতিত হয়েও দলের দুর্দিনে ভূমিকা রাখা বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতার নাম জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। এমনকি পার্বত্য অঞ্চলসহ বিভিন্ন অবহেলিত বা বিশেষ এলাকার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে নতুন সংসদ সদস্যদের নামও বিবেচনায় রয়েছে।
এই সব বিবেচনায় মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে পারেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, রুহুল কবির রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক, বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান, কৃষক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল, মাহমুদা হাবিবা (সংরক্ষিত আসন), সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, সাচিং প্রু জেরি, মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিঙ্কন, মো. আবুল কালাম, বীথিকা বিনতে হোসাইন (সংরক্ষিত আসন) প্রমুখ। যদিও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার আকার ৫০ সদস্যের কাছাকাছি রয়েছে, যার মধ্যে পূর্ণমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছেন। এর বাইরেও বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেন্দ্র করে শূন্য হতে যাওয়া পদগুলোর কারণে পুরো মন্ত্রিসভাতেই একটি বড় ধরনের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁও-১ আসনও শূন্য হবে। ফলে সেখানে উপনির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তার পরিবারের সদস্যদের নাম নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। একই সঙ্গে সংসদ উপনেতা কে হবেন, সেটিও পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ পদে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নাম আলোচনায় রয়েছে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুইজন সদস্য বলেন, দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরেই বিএনপির দলীয় কাঠামো, মন্ত্রিসভা এবং সংসদীয় রাজনীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ায় তার ছেড়ে দেওয়া দলীয় ও সরকারি পদগুলোতে কারা আসছেন, তা নিয়ে ইতোমধ্যে বিএনপি এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরপরই বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হতে পারে। একই সময়ে মন্ত্রিসভায়ও সীমিত পরিসরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপরই নির্ভর করছে।
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়ে রিজভীকে ঘিরে আলোচনা : মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বিএনপির মহাসচিব পদটি শূন্য হবে। এই পদে তাৎক্ষণিকভাবে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নিয়ে দলের ভেতরে একাধিক নাম আলোচনায় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে সদ্য জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়া রুহুল কবির রিজভীর নাম।বিএনপির একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর ওইদিন রাতে কিংবা পরদিন রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তার হাতে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও পরিবর্তন আসবে। আর এ পরিবর্তনকে ঘিরেই সরকারের ভেতরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে। আলোচনা করা হচ্ছে দলের যিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হবেন পদাধিকার বলে তাকেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে হয় মন্ত্রী নয়তো উপদেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, পুনর্গঠন বা রদবদল দল ও সরকারের ক্ষেত্রে রুটিন ওয়ার্ক। প্রয়োজনের তাগিদেই পুনর্গঠন বা রদবদল করা হয়। সরকারপ্রধান প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলে তিনিই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে সে ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কার্যসম্পাদনের মূল্যায়নও বিবেচনায় নেওয়া হয়।