→ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আরেকটি সুখবর→ একাদশে দ্বিতীয় ধাপে ভর্তির আবেদন শুরু আজ→ প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ না পাওয়া প্রার্থীদের যে বার্তা দিলেন শিক্ষামন্ত্রী→ ৫ গোলের দারুণ লড়াইয়ে ইংল্যান্ডকে হারাল স্পেন→ দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী
No icon

সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে

৯ আগস্ট, ২০২৬। কমলাপুর রেলস্টেশন। কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস। ছাড়ার সময় রাত ৮টা। ছেড়েছে রাত সাড়ে ১১টায়। লালমনিরহাট এক্সপ্রেস। ছাড়ার নির্ধারিত সময় রাত পৌনে ১০টা। ছেড়ে যায় রাত পৌনে ২টায়।যাত্রীদের অভিযোগ, ট্রেনের সময়সূচির এমন বিপর্যয় নিয়মিত ঘটনা। রেল কর্তৃপক্ষ জানায়, ইঞ্জিন কম থাকায় মাঝে মাঝে সময়সূচি ঠিক রাখতে সমস্যা হয়।যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে ২০২২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রায় ১ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০টি ইঞ্জিন কেনা হয়। এর ২৩টি এখন অকেজো! এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড থেকে ঋণ নিয়ে এসব ইঞ্জিন কেনা হয়েছিল।ঋণ নিয়ে করা অনেক প্রকল্পের এমন অবস্থা। প্রকল্প থেকে মানুষের যেসব সুবিধা পাওয়ার কথা, বাস্তবে তা পাওয়া যায় না। এর মূল কারণ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। আবার বিদেশি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতির ওপর এর চাপ তৈরি হচ্ছে। আর ঋণ পরিশোধে বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে।সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক বৈঠকে স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিডি) অধীন কিছু প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উচ্চ সুদহার এবং প্রকল্পের অকার্যকর ফলাফলের উদাহরণ তুলে ধরেন ইআরডির কর্মকর্তারা।বৈঠকে এমন মত আসে, গত ২৫ বছরে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে একের পর এক বিদেশি ঋণনির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। বরং বৈদেশিক ঋণের বোঝা বেড়েছে। ক্রমবর্ধমান সুদের কারণে স্থানীয় সরকার বিভাগের ওপর বিদেশি ঋণের দীর্ঘস্থায়ী নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক উৎস থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৯ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ১২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা।আইএমএফের সর্বশেষ মূল্যায়নে বাংলাদেশের ঋণঝুঁকি নিম্ন থেকে মধ্যম পর্যায়ে গেছে বলে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপুল অঙ্কের ঋণের আসল ও উচ্চ সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের রাজস্ব বাজেটের ওপর চাপ বাড়ছে।অর্থ মন্ত্রণালয়ের আরেকটি অভ্যন্তরীণ নথিতে বলা হয়েছে, সরকারের মোট ঋণের তুলনায় বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি আরও তীব্র হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবর্তনশীল সুদহারের ঋণের অংশ বাড়ায় সুদ পরিশোধের ঝুঁকিও বাড়ছে।এ অবস্থায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের নতুন বিদেশি ঋণ গ্রহণের সীমা-সংক্রান্ত শর্ত আরোপ করে আইএমএফ। সংস্থার ঋণ কর্মসূচির আওতায় দেওয়া শর্ত অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা ৮৪৩ কোটি ৭৩ লাখ ডলার নির্ধারণ করে দেয়।  অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রণীত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার শ্বেতপত্রে বলা হয়, গত ১৫ বছরে ভৌত অবকাঠামো, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে মেগা প্রকল্পের নামে অতিরিক্ত ব্যয় প্রাক্কলন, রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি এবং নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে। এসব প্রকল্পের অধিকাংশ ছিল দেশি-বিদেশি ঋণের অর্থে।সম্প্রতি করা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মূল্যায়নেও বেশ কিছু বিদেশি ঋণের প্রকল্পে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

রেলের সময় যে কারণে ঠিক থাকে না

দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কেনা ৩০০০ সিরিজের ৩০টি ইঞ্জিনের মধ্যে মাত্র চার বছরে ২৩টি প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। ঢাকার কমলাপুর ওয়ার্কশপে গিয়ে দেখা যায়, এ সিরিজের ৩০০৮ নম্বরের ইঞ্জিনটি একেবারে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। মেকানিক দেলওয়ার হোসেন জানান, কিছুদিন ধরে ইঞ্জিনটি অকেজো অবস্থায় এখানে রয়েছে।অন্য একজন মেকানিক বলেন, এ সিরিজের ইঞ্জিনগুলো প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায়। পরে সেগুলো ওয়ার্কশপে আনা হয়। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ না থাকা ও সারানোর যোগ্য না হওয়ায় ঈশ্বরদী কিংবা চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এগুলোর অধিকাংশই এমন অবস্থায় গেছে, ঠিক করা সম্ভব না-ও হতে পারে।রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পরিকল্পিতভাবে নিম্নমানের এসব ইঞ্জিন কেনা হয়। এতে রাষ্ট্র তথা জনগণের ক্ষতি হলেও সিন্ডিকেটের পকেট ভারী হয়েছে। তখন রেলমন্ত্রী ছিলেন নুরুল ইসলাম সুজন।

বাংলাদেশ রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (লোকো) মো. বোরহান উদ্দিন  বলেন, প্রতিবছর ইঞ্জিনগুলো সার্ভিসিং করা দরকার ছিল। কিন্তু যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়নি। এসব ইঞ্জিনের কার্যকারিতা ২০ বছর থাকলেও গত বছরের আগস্টে ৩০টি ইঞ্জিনের মধ্যে মাত্র সাতটি সচল ছিল। পরে কিছু ইঞ্জিন সার্ভিসিং করায় বর্তমানে ১৩টি ইঞ্জিন চলাচলের উপযোগী। অন্যগুলোও সার্ভিসিং করা হবে।ট্রেনের সূচি বিপর্যয় বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবেই যাতায়াতে কিছুটা বেশি সময় লেগে যায়। অতিরিক্ত ট্রেন বা ইঞ্জিন থাকলে এ বাড়তি সময়টুকু পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো। প্রায় ৩০টি ইঞ্জিনের প্রয়োজন হলেও কখনও ১২ থেকে ১৩টি অথবা ১৬টি ইঞ্জিন পাওয়া যায়। ইঞ্জিন সংকটের কারণে শিডিউল বিপর্যয় বেড়ে যায়। ৩০০০ সিরিজের সব ইঞ্জিন সচল থাকলে শিডিউল বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো।

ইঞ্জিন ছিল নিম্নমানের, হয়েছে দুর্নীতি

২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি হুন্দাই রোটেমের সঙ্গে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইঞ্জিন কেনার চুক্তি করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এডিবির কাছ থেকে ঋণ নিয়ে প্রথম ধাপে ২৯৮ কোটি টাকায় ১০টি ইঞ্জিন কেনা হয়। পরে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড থেকে ঋণ নিয়ে ৮৪১ কোটি টাকায় আরও ২০টি ইঞ্জিন কেনা হয়।প্রথম ধাপের ১০টি ইঞ্জিন ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে সরবরাহ করে হুন্দাই। চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসের পর রেলওয়ের কমিশনিং কমিটি পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় দেখা যায়, ইঞ্জিনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ চারটি কারিগরি উপাদান (মেইন ইঞ্জিন, অলটারনেটর, কম্প্রেসর ও ট্র্যাকশন মোটর) চুক্তিতে উল্লেখ করা মডেলের চেয়ে নিম্নমানের।ওই বছরের ৩১ আগস্ট রেলওয়ের নিযুক্ত পরিদর্শক প্রতিষ্ঠান গ্রিন বাংলা ইন্সপেকশন কোম্পানি লিমিটেড ১০টি ইঞ্জিনকে ত্রুটিপূর্ণ বলে উল্লেখ করে। এরপর তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক নুর আহম্মদ হোসেন চুক্তির শর্তবহির্ভূত এসব ইঞ্জিন গ্রহণে আপত্তি জানান। একই সঙ্গে কার্যকারিতা পরীক্ষা ও ট্রায়াল রানের মাধ্যমে কমিশনিংয়ের সুপারিশ করেন।রেলওয়ে রোলিং স্টক (লোকোমোটিভ, রিলিফ ক্রেন ও লোকোমোটিভ সিমুলেটর ক্রয়) প্রকল্পের ওপর মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষায় চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে নিম্নমানের ইঞ্জিন কেনার বিষয়টি ধরা পড়ে।সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইঞ্জিনের বিষয়ে গঠিত চার সদস্যের কারিগরি কমিটি ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর প্রতিবেদন দেয়। এতে দেখা যায়, চুক্তিতে নির্ধারিত ১২ সিলিন্ডারের ৭১০ সিরিজের মেইন ইঞ্জিনের পরিবর্তে ৮ সিলিন্ডারের ইঞ্জিন দেওয়া হয়েছে। ৩০০০ হর্সপাওয়ারের অলটারনেটরের বদলে দেওয়া হয়েছে ২০০০ হর্সপাওয়ার। একইভাবে নির্ধারিত মডেলের ট্র্যাকশন মোটর দেওয়া হয়নি। কম্প্রেসরেও চুক্তির শর্তের সঙ্গে অমিল পাওয়া যায়। কমিটি জানায়, এসব ত্রুটিপূর্ণ উপাদান দিয়ে তৈরি ইঞ্জিন সফলভাবে চালানো সম্ভব নয়।