খুলনার সোলার পার্কের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৬ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ দিয়ে পুরো সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকা অথবা কেডিএ অ্যাভিনিউর মতো ছয়টি বড় সড়কের সব বাতি জ্বালানো সম্ভব। অথচ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ২০১২ সাল থেকে বন্ধ আছে কেন্দ্রটি। সরেজমিন দেখা যায়, সোলার প্যানেলগুলো এখনও সচল; মাত্র ১০ লাখ টাকা খরচ করলেই প্রতিদিন ১৬ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়াতে ২০০৮ সালে খুলনার সোনাডাঙ্গায় কেসিসির দিঘিরপাড়ে তৈরি করা হয় ২০ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) যৌথ উদ্যোগে তৈরি কেন্দ্রটি ছিল ওই সময় দেশে প্রথম ও সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র।তবে ২০১০ সালের পর থেকে সোলার প্যানেলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। যন্ত্রপাতি ও এর তার চুরি হয় কয়েক দফা। তদারকি ও সংস্কারের অভাবে ২০১২ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রের অভাবে বন্ধ হয়ে যায় ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। এরপর কয়েকবার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি চালুর উদ্যোগ নিলেও চালু হয়নি। প্রায় ১৪ বছর ধরে অলস পড়ে আছে কোটি টাকার সরঞ্জাম ও স্থাপনা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যাটারি, ইনভার্টারসহ অল্প কিছু সরঞ্জাম মেরামত করলেই কেন্দ্রটি পুনরায় চালু করা সম্ভব। এতে সর্বোচ্চ ব্যয় হতে পারে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা।
কেসিসি জানিয়েছে, ২০০৭ সালে খুলনার সন্তান জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপক ড. বিভূতি রায় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নির্মাণের জন্য কেসিসিকে জমি সংস্থানের অনুরোধ জানান। তিনিই খুলনা বিভাগের জন্য প্রমোশন অব রিনিউএবল (সোলার) এনার্জি প্রকল্প তৈরি করে দাতা সংস্থার কাছ থেকে এক কোটি পাঁচ লাখ টাকার অনুদান সংগ্রহ করেন। কেসিসির পক্ষ থেকে সোনাডাঙ্গা প্রথম ও দ্বিতীয় আবাসিক এলাকার মাঝে পরিত্যক্ত চার দশমিক ৩৩ একর জমি চূড়ান্ত করা হয়। প্রশাসনের সহযোগিতায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ২০০৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর সৌরবিদ্যুৎ প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের নির্মাণকাজ শুরু হয়।এই প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন কেসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) জাহিদ হোসেন শেখ। বর্তমানে অবসরে থাকা জাহিদ হোসেন শেখ বলেন, ট্রেনিং সেন্টারের কাজ শেষ হলে ২০০৮ সালে সেন্টারের ছাদে চার হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাসম্পন্ন ২২২টি সোলার মডিউল স্থাপন করা হয়। ওই সময় প্রতিদিন ১৫০-১৬০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো। পার্কের সৌরবাতি, ট্রেনিং সেন্টারে ব্যবহারের পর বাকি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হতো। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট তিন টাকা ৯৮ পয়সায় কিনে নিতে সম্মত হয় ওজোপাডিকো। কয়েক বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল। এর পর পুরোনো যন্ত্রাংশগুলো নষ্ট হলে ২০১২ সালের পর আর মেরামত করা হয়নি।
গত ১৪ মে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ঘুরে দেখা গেছে, ভবনের ছাদে স্থাপিত প্যানেলে বেশির ভাগ এখনও সচল। ব্যাটারি, ইনভার্টারসহ কন্ট্রোল রুমের বেশির ভাগ সরঞ্জাম অকেজো হয়ে গেছে। অনেক তার চুরি হয়েছে। এগুলো সংস্কার করলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি পুনরায় চালু করা সম্ভব।সৌর প্যানেলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা জানা গেছে, ২০ কিলোওয়াটের ইনভার্টার, কিছু ব্যাটারি ও তার কেনায় সর্বোচ্চ ব্যয় হতে পারে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা। পাশাপাশি নেট মিটারিং চালু করতে ওজোপাডিকো বরাবর আবেদন, কেন্দ্র তদারকির জন্য তিন শিফটে পৃথক জনবল প্রয়োজন হবে।কেসিসির প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান বলেন, ইতোপূর্বে কয়েকবার সোলার ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজ হয়নি। কীভাবে চালু করা যায়, আমরা আলোচনা করে দেখব। বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, জ্বালানি সমস্যার কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না সরকার। এমন সংকটের সময় কেসিসির সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দ্রুত চালু করা উচিত।