ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা-পাল্টা হামলা চলমান থাকায় দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিয়েছে বিএনপি সরকার। ইতোমধ্যে ভারতের কাছ থেকে বাড়তি ডিজেল চাওয়া হয়েছে। দাম বেশি হলেও স্পট মার্কেট থেকে তিন কার্গো এলএনজি কিনছে।সর্বশেষ রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। কারণ, রাশিয়ার তেল কেনায় যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে দেশটি ইতোমধ্যে রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতকে একটি অস্থায়ী সুবিধা দিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও একই ধরনের সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চাওয়ার কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।বুধবার ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্র্যান্ড টি ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান মন্ত্রী। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনামন্ত্রীর কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অস্থির হয়ে উঠেছে বিশ্ব জ্বালানি বাজার। সম্প্রতি ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়েছিল। এখনও তা ৯০ ডলারের ওপরে। এই অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। সংকট আতঙ্কে গত এক সপ্তাহ ধরে পাম্পগুলোতে ছিল ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল কিনতে হয়েছে চালকদের। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) তেল সরবরাহ এবং বিক্রিতে রেশনিং চালু করে। তবে গতকাল বুধবার থেকে তেল সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তার পরও ক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। বুধবারও পাম্পগুলোতে গাড়ির বড় লাইন দেখা গেছে।যুক্তরাষ্ট্রের ছাড় চাওয়া প্রসঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আমরা বলেছি বাংলাদেশকেও যদি ভারতের মতো রাশিয়ার তেল কেনার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তা আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় সহায়তা হবে। বিষয়টি তারা ওয়াশিংটনে পাঠাবে বলে জানিয়েছে। এখন দেখা যাক কী হয়।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে তেল ও গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারের করণীয় কী হবে এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতির বিভিন্ন সম্ভাব্য দিক বিবেচনায় নিয়ে সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুদ্ধ যদি স্বল্পমেয়াদি হয়, মধ্যমেয়াদি হয় কিংবা দীর্ঘস্থায়ী হয় প্রতিটি পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে আমরা পরিকল্পনা করছি। আজকে এ বিষয়গুলো নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। স্পট মার্কেট থেকে আরও তিন কার্গো এলএনজি কিনছে বাংলাদেশ
বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতার মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে আরও তিন কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। গতকাল ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রায় দুই হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যভিত্তিক টোটাল এনার্জিসের কাছ থেকে এক কার্গো এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পস্কো ইন্টারন্যাশনাল থেকে দুই কার্গো এলএনজি কেনা হবে। টোটাল এনার্জিসের কার্গোর মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউ ২১ দশমিক ৫৮ মার্কিন ডলার এবং পস্কোর দুই কার্গোর মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউ ২০ দশমিক ৭৬ মার্কিন ডলার।এর মধ্যে প্রথম কার্গো আগামী ৫-৬ এপ্রিল, দ্বিতীয় কার্গো ৯-১০ এপ্রিল এবং তৃতীয় কার্গো ১২-১৩ এপ্রিলের মধ্যে সরবরাহ করা হবে। টোটাল এনার্জিসের একটি কার্গো কিনতে ব্যয় হবে ৯০৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। পস্কোর কার্গো প্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৭৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
ভারতের কাছে বাড়তি ডিজেল
জ্বালানি তেল সংকট মোকাবিলায় ভারতের কাছে বাড়তি ডিজেল চেয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে কথা হয়। পরে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আপৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারত সরকারকে বাড়তি ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রণয় কুমার ভার্মা জানান, বাংলাদেশ সরকারের চিঠি গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি ভারতের সরকারের কাছে তুলে ধরা হবে।ভারতের শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত ১৩১ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ডিজেল পরিবহন করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, এই পাইপলাইনের মাধ্যমে চলতি বছর প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করার কথা রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এর বাইরে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে সরকার।
সরবরাহ বৃদ্ধি
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিপিসি বিভাগীয় শহরগুলোতে অকটেন ও পেট্রোলের সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিপিসি জানায়, আগে অকটেন ও পেট্রোলের সরবরাহ গড় বিক্রির তুলনায় ২৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। এখন সেই হ্রাসের হার কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে বিভাগীয় শহরগুলোর ফিলিং স্টেশনগুলোতে বরাদ্দ অনুযায়ী সরবরাহ ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে বন্দরে জাহাজ
সিঙ্গাপুর থেকে প্রায় ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে লিয়ান হুয়ান হু নামে একটি ট্যাংকার চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে। গত মঙ্গলবার বিকেলে জাহাজটি বন্দরে আসে এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে ডিজেল খালাস শুরু হয়েছে। এর আগে গত সোমবার শিউ চি নামে আরেকটি জাহাজ ২৭ হাজার ২০৪ টন ডিজেল নিয়ে বন্দরে পৌঁছায়। আমদানির পাইপলাইনে রয়েছে আরও তিনটি বড় জাহাজ। আজ ১২ মার্চ এসপিটি থেমিস নামে আরেকটি জাহাজে আসবে ৩০ হাজার ৪৮৪ টন ডিজেল নিয়ে। কাল ১৩ মার্চ র্যা ফেলস সামুরাই নামে আরেকটি জাহাজে আসবে প্রায় ৩০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে। ১৫ মার্চ চাং হাং হং তু নামে জাহাজে আসবে প্রায় ৩০ হাজার টন। সব মিলিয়ে আগামী কয়েকদিনে মোট এক লাখ ৪৪ হাজার ২০৫ টন পরিশোধিত ডিজেল জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। বর্তমান ব্যবহারের পরিমাণ অনুসারে এই ডিজেল দিয়ে ১২ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
পাম্পে এখনও লাইন
সরবরাহ বাড়ানোর কথা বললেও গতকাল পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। পাম্প মালিকরা বলছেন, দুই-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। এদিকে সিলেট নগরীতে বাড়িতে ৮০০ লিটার ডিজেল মজুতের দায়ে তিনজনকে তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ছাড়া একটি পেট্রোল পাম্পে হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনজনকে। কিশোরগঞ্জের ভৈরবে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা যমুনা অয়েল কোম্পানির ডিপো ইনচার্জকে প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে কর্তৃপক্ষ তেল দেওয়ার আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।