ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবার সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রীস্থানীয় নির্বাচন এককভাবে করবে জামায়াতমালয়েশিয়াকে হারিয়ে পঞ্চম বাংলাদেশইরাক থেকে ড্রোন হামলার পর সৌদির প্রধান তেল পাইপলাইন বন্ধডেঙ্গুতে সেপ্টেম্বরের ১১ দিনে আগস্টের চেয়ে বেশি মৃত্যু
No icon

স্থানীয় নির্বাচন এককভাবে করবে জামায়াত

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে লড়াই করলেও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সংসদ নির্বাচনে জোটের রাজনীতি আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজস্ব শক্তির পরখ করা- এই দুই কৌশল নিয়ে ভোটের মাঠে এগোচ্ছে দলটি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের মাধ্যমে শরিকদের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নিলেও আসন্ন ১৩টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেই সমীকরণ সরাসরি কাজে লাগাতে চাইছে না জামায়াত, বরং অধিকাংশ সিটে এককভাবে মেয়র প্রার্থী দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি, ভোটের ভিত এবং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে চাইছে। ফলে এবারের সিটি নির্বাচন দলটির জন্য শুধু মেয়র পদে জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির বাইরে নগরভিত্তিক নিজস্ব শক্তির একটি বড় পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।রাজনৈতিক পর্যবেক্ষদের মতে, জাতীয় নির্বাচনে বৃহত্তর ঐক্য এবং স্থানীয় নির্বাচনে নিজস্ব শক্তি- জামায়াতের এই দ্বৈত কৌশলের মধ্যেই এবারের সিটি নির্বাচনের রাজনৈতিক গুরুত্ব নিহিত। একদিকে জোটের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা, অন্যদিকে এককভাবে ভোট করে সাংগঠনিক শক্তির বাস্তব চিত্র পাওয়া- দুই লক্ষ্যই সামনে রেখে এগোচ্ছে দলটি। তাই ১৩টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন শুধু স্থানীয় সরকারের মেয়র নির্বাচন নয়; জামায়াতের নগর রাজনীতিতে বিস্তার, জোটসঙ্গীদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এবং পরবর্তী নির্বাচনী কৌশলের দিকনির্দেশনাও অনেকটা নির্ধারণ করতে পারে এই ভোটের ফলাফল।

দলের একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে জামায়াতের মূল বিবেচনা- স্থানীয় নির্বাচন হবে স্থানীয়ভাবেই। জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সমীকরণের চেয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাস্তবতা, স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামত, সাংগঠনিক সক্ষমতা, প্রার্থীর পরিচিতি এবং ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতাকে প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সে কারণে জাতীয় নির্বাচনের মতো আসন ভাগাভাগি বা শরিকদের সঙ্গে ব্যাপক সমঝোতার পথে না গিয়ে নিজেদের প্রার্থী নিয়েই মাঠে নামতে চাইছে দলটি। তবে এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্তকে জোটের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। জামায়াত নেতারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনের চরিত্র ও জাতীয় নির্বাচনের চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। তাই স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে আলাদা কৌশল নেওয়া হলেও রাজনৈতিক জোটের সম্পর্ক অক্ষুণ্ন থাকবে। তবে শরিক দলের একাধিক শীর্ষ নেতা প্রতিবেদককে জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জামায়াত এককভাবে করলে টানাপড়েন তো হবেই।জামায়াতের এই কৌশলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে পারে রাজধানীতে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং ঢাকা দক্ষিণে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমকে মেয়র প্রার্থী করা হয়েছে। ঢাকার দুই সিটিতেই মেয়র পদে কোনো ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা নেই দলটির। ঢাকা দক্ষিণে সাদিক কায়েমের প্রার্থিতা অবশ্য আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। একই নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রার্থী করায় দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হতে পারে। জাতীয় পর্যায়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের অংশীদার দুই দলের দুই পরিচিত মুখের এই লড়াই তাই শুধু স্থানীয় নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে থাকবে না; এর মধ্য দিয়ে দুই দলের নগরভিত্তিক সংগঠন, জনপ্রিয়তা ও ভোটার সমর্থনের তুলনামূলক চিত্রও সামনে আসতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের কাছে কে কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটিও এই লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠতে পারে।

রাজধানীর বাইরে জামায়াতের প্রার্থী বাছাইয়েও রয়েছে ভিন্ন ধরনের হিসাব। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী এবং বরিশালে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলালকে প্রার্থী করা হয়েছে। খুলনায় দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারকে প্রার্থী করার পরিকল্পনা রয়েছে। রংপুরে মহানগর আমির এটিএম আজম খানকে প্রার্থী করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এসব নগরে দলীয় পরিচিতি ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে জামায়াত।গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জেও একই সঙ্গে অভিজ্ঞতা ও নতুন নেতৃত্বের সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। গাজীপুরে ড. মুহাম্মদ হাফিজুর রহমানকে প্রার্থী করা হয়েছে। দীর্ঘদিন তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা এই প্রার্থীর শিক্ষাগত ও পেশাগত পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে মহানগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ আবদুল জব্বারকে মেয়র প্রার্থী করা হয়েছে। সাবেক ছাত্রনেতা হিসেবে তার দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাও প্রার্থী বাছাইয়ে ভূমিকা রেখেছে। রাজশাহীতে ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, বগুড়ায় সাবেক জিএস আ খ ম আব্দুল মালেককে প্রার্থী করা হয়েছে। সিলেটে মাওলানা লোকমান আহমদ এবং ময়মনসিংহে অধ্যাপক শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম দলীয়ভাবে বিবেচনায় রয়েছে। কুমিল্লায় মহানগর জামায়াতের আমির মোসলেহ উদ্দিনকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

প্রার্থী তালিকার দিকে তাকালে জামায়াতের কৌশলের আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়- দলটি শুধু সাংগঠনিক পদধারীদের ওপর নির্ভর করছে না; বরং যেখানে যে ধরনের প্রার্থী ভোটারদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হতে পারেন, সেই হিসাবও করা হচ্ছে। কোথাও মহানগর আমির, কোথাও কেন্দ্রীয় নেতা, কোথাও চিকিৎসক, শিক্ষক বা সাবেক ছাত্রনেতাকে সামনে আনা হয়েছে। অর্থাৎ সিটি নির্বাচনের লড়াইকে কেবল দলীয় প্রতীকের শক্তিতে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রার্থীর নিজস্ব পরিচিতি ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকেও কাজে লাগাতে চাইছে জামায়াত, এ কথা বলেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম।তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগতভাবে পাওয়া সমর্থন স্থানীয় নির্বাচনে সরাসরি প্রতিফলিত হবে- এমন নিশ্চয়তা নেই। সিটি নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, ওয়ার্ডভিত্তিক সংগঠন, স্থানীয় সমস্যা নিয়ে অবস্থান, সামাজিক যোগাযোগ এবং ভোটারদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে এককভাবে প্রার্থী দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে জামায়াতের প্রকৃত নগরভিত্তিক ভোটের শক্তি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। কোথায় সংগঠন শক্তিশালী, কোথায় প্রার্থী জনপ্রিয়, কোথায় জোটের ওপর নির্ভরতা প্রয়োজন- সে হিসাবও এই নির্বাচনের ফল থেকে বের করা সম্ভব বলে জানান তিনি।

এ কারণে এবারের সিটি নির্বাচন জামায়াতের জন্য এক ধরনের সাংগঠনিক নিরীক্ষাও। জাতীয় রাজনীতিতে দলটির প্রভাব যতই বাড়ুক, নগর পর্যায়ে ভোটারদের মধ্যে সেই প্রভাব কতটা বিস্তৃত তার উত্তর পাওয়া যাবে ব্যালটে। কোনো সিটে জয় এলে সেটি স্থানীয় রাজনীতিতে জামায়াতের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করবে। আবার প্রত্যাশিত ফল না এলে প্রার্থী বাছাই, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং স্থানীয় ভোটের বাস্তব সমীকরণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে দলটিকে।অন্যদিকে স্থানীয় নির্বাচনে জোটসঙ্গীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা জোটের ভেতরের রাজনীতিতেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থী মুখোমুখি হলে মাঠপর্যায়ে দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে। তবে এটিকে এখনই জোটের ভাঙন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের ভিন্ন চরিত্রের কারণে একই রাজনৈতিক জোটের দলগুলোও নিজেদের শক্তি যাচাইয়ের জন্য আলাদা কৌশল নিতে পারে।