
ইসলামে উত্তরাধিকার আইন বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান এবং সীমারেখা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি তার ওয়ারিশদের মধ্যে সঠিকভাবে বন্টনের বিষয়ে আলেম ওলামাগন লেখালেখি এবং ওয়াজ নসিহতের মাধ্যমে মৌলিক বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করে থাকেন।
বর্তমানে আমাদের সমাজে কিছু কিছু মানুষ কৌশলের মাধ্যমে ইসলামী উত্তরাধিকার আইন ফাঁকি দিতে চেষ্টা করেন। শুধু তাই নয়, উত্তরাধিকার সম্পদ মেরে দেয়ার জন্য নানান রকমের হেকমত বা কূট-কৌশল অবলম্বন করেন। তারা ভুলে যান যে আল্লাহর কৌশলের কাছে মানুষের ষড়যন্ত্র বা কূট-কৌশল কিছুই না। আল্লাহ বলেনঃ
”অতঃপর তারা ষড়যন্ত্র করল এবং আল্লাহও কৌশল প্রয়োগ করলেন। বস্তুতঃ আল্লাহ সর্বোত্তম কৌশলী।” -সূরাঃ আলে-ইমরান, আয়াতঃ ৫৪
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ”আমি তাদের সময় দিয়ে থাকি। আমার কৌশল অত্যন্ত বলিষ্ঠ।” -সূরাঃ আরাফ, আয়াতঃ ১৮৩
পবিত্র কুরআনে উত্তরাধিকার সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার কঠিন শাস্তির কথা ও কুরআন এবং হাদিসে জোর দিয়ে বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত উত্তরাধিকার আইন যথাযথভাবে আল্লাহর সীমারেখার মধ্যে পালন করার ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি । এতে কারো নিজস্ব অভিমত ও অনুমানের ভিত্তিতে এটা পরিবর্তন-পরিবর্ধন করার কোন অধিকার নেই। এসব ব্যাপারে অসাবধানতা ও শৈথিল্য প্রদর্শন আল্লাহর আদেশের পরিপন্থী
কিন্তু আমাদের পরিবার ও সমাজ বাস্তবতায় দেখা যায় যে, কিছু অতি চালাক মানুষ ভাই-বোনদেরকে উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার হীন উদ্দেশ্যে মা-বাবার মৃত্যুর পূর্বেই নানান রকম ষড়যন্ত্র ও কুটকৌশল অবলম্বন করে থাকেন। যা অত্যন্ত গর্হিত এবং নিন্দনীয়। এই সব কুটকৌশল গুলোর মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হলোঃ
১/ পারিবারিক সম্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে মাতা-পিতার নামে ক্রয় না করে ভাইয়েরা নিজেদের নামে ক্রয় করে থাকে, যেন বোনেদেরকে সম্পত্তিতে ভাগ দিতে না হয়।
২/ বোনেরা যেন পৈত্রিক সম্পত্তি দাবি করতে না পারে তাই পিতা জীবিত থাকতেই ছলে বলে কৌশলে ভাইয়েরা নিজেদের নামে সম্পত্তি নিয়ে নেয়। বোনেরা যদি বয়সে ছোট হয়, তাহলে তো আর কথাই নেই, পরিবারে ভাইয়ের অবদান বেশি বলে বাবার সম্পত্তি ভাইয়েরা দখল করে নেয় এবং ঘোষণা করে দেয় যে বাবার কিছুই ছিলোনা এবং নেই। সব কিছুই ভাইদের অর্জন।
৩/ ভাইয়েদের নিজের সম্পত্তি থাকা সাপেক্ষেও বাবার নামের সম্পত্তি ব্যাংকে বন্ধক দিয়ে বড় অংকের ঋণ নিয়ে থাকে। যা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ ও আমোদ-ফুর্তিতে খরচ করে কিংবা নিজেদের নামে অন্যত্র সম্পদ ক্রয় করে। কিন্তু কখনোই ব্যাংকের ঋণ শোধ করে না। ভবিষ্যতে বোনেরা সম্পত্তির দাবি করলে তাদেরকে ব্যাংকের ঋণ শোধ করার চাপ দেয়া হয়। ফলে বোনেরা কখনো ঋণও শোধ করতে পারেনা তাই সম্পত্তিও আর পায়না।
৪/ বোনেদের লেখাপড়া কিংবা বিয়ে-শাদীতে অনেক খরচপাতি হয়েছে এজন্য ভবিষ্যতে বোনেরা আর কোন সম্পত্তি দাবি করা উচিত নয়। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এই ধরনের ধারণা আগেভাগেই বোনেদের মাথায় প্রতিষ্ঠিত করে দেয়া হয়।
৫/ বোনেরা সম্পত্তি দাবি করলে ভাইয়েরা বোনেদের সেই দাবিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে থাকে। এমনকি ভাই বোনের সম্পর্কচ্ছেদের হুমকি দিয়ে থাকে। কিংবা, কাগজপত্র জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বাবার সম্পত্তি ভাইয়েরা দলিল করে নেয়।
৬/ এমনকি যেসব বোনেরা সম্পত্তি নিয়ে গেছে তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের মাধ্যমে অন্যদেরকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়। ফলশ্রুতিতে সমাজে সকল বোনদের মধ্যে এই ভীতিকর ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। আবার অনেকে পারিবারিক সুনাম নষ্ট হওয়ার ভয়ে সম্পত্তির দাবিই করে না।
৭/ বোনেদের বিপদে-আপদে কোনো রকমের সাহায্য সহযোগিতা করে থাকলে সেই বাবদ তাদের প্রাপ্য সম্পত্তি কেটে নেয়া হয়। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে বোনেরা ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসবে এই বাবদ ও ভাইয়েদের কাছে কিছু সম্পত্তি রেখে দেয়া হয়। যতটুকু দেওয়া হয়, তাও সবচেয়ে কম মূল্যের অথবা মামলা-মকদ্দমাযুক্ত সম্পত্তি দিয়ে বুঝ দেওয়া হয়। যেহেতু, বোনেরা সম্পত্তি তদারকির দায়িত্বে ছিল না, তাই তারা বুঝতেও পারে না এবং একটা সময় পরে প্রাপ্ত সম্পতি বেহাত হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ সমঝোতার নামে যতসামান্য কিছু নগদ টাকা দিয়ে বোনেদের সম্পত্তির দাবি ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
পবিত্র কোরআনে বোনের সম্পত্তিকে মহান আল্লাহর নির্ধারিত সীমা আখ্যা দেয়া হয়েছে এবং সুষ্ঠুভাবে বুঝিয়ে দেওয়া জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
”এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের অনুসরণ করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, তারা তাতে চিরস্থায়ী হবে এবং এটা বিরাট সাফল্য।” -সূরাঃ নিসা, আয়াতঃ ১৩
আর যারা বোনের সম্পত্তি বুঝিয়ে দেয় না, তাদের জাহান্নামের অপমানজনক শাস্তির ভয় দেখানো হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
”আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নাফরমানী করে এবং তাঁর সীমারেখা লঙ্ঘন করে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে চিরস্থায়ী হবে। আর তার জন্যই রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।“ -সূরাঃ নিসা, আয়াতঃ ১৪
আফসোস হয় সেসব মানুষদের জন্য, যারা মসজিদে জামাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করছেন, হজ করছেন, প্রতি বছর জাকাতও দিচ্ছেন, সুদ-ঘুষ খান না, মদ পান করেন না, নষ্টামি নোংরামিতে জড়িত নন, ছেলে-মেয়েদের মাদরাসায় পড়াচ্ছেন, নিজেকে দ্বীনদার ও পরহেজগার বলে দাবি করেন, কিন্তু জেনে-বুঝে, স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে ভাই-বোনদের পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেন কিংবা এমন কৌশল অবলম্বন করেন যাতে ভাই-বোনেরা কোন সম্পত্তির অংশীদার হতে না পারে।
এসব জালেমদের সম্পর্কে হাদিসে বলা হয়েছেঃ “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত জমি দখল করবে কিয়ামতের দিনে তার গলায় সে জমি ঝুলিয়ে দেয়া হবে।” -সহিহ মুসলিম, হাদিসঃ ১৬১০
আজমাইন নিজাম