নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধযুদ্ধবিরতির পরও গাজায় এবছর ৯ শতাধিক মানুষ নিহতকয়েক মাসের মধ্যেই পুরো সংসদ চলবে সৌরবিদ্যুতে : প্রধানমন্ত্রীময়মনসিংহে দুই বাসের সংঘর্ষে নিহত ৩তারেক রহমানের ১৯তম কারামুক্তি দিবস আজ
No icon

আর্কটিকে উত্তেজনা: গ্রিনল্যান্ডে প্রথমবার সেনা পাঠাল ডেনমার্ক

আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে সাম্প্রতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় নিয়োজিত সৈন্যদের গ্রিনল্যান্ডে মোতায়েন করেছে ডেনমার্ক।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের দাবি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই কোপেনহেগেনের এ পদক্ষেপকে আর্কটিকে নিজেদের উপস্থিতি ও সার্বভৌমত্বের দৃশ্যমান বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড বরাবরই গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

গ্রিনল্যান্ডে পাঠানো সৈন্যরা ডেনমার্কের সম্প্রসারিত ১১ মাসের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা কর্মসূচির প্রথম ব্যাচের সদস্য। গত আগস্টের শুরুতে শ্লেসভিগ পদাতিক রেজিমেন্টের এই দলটি গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছে। তাদের নুক ও কানগারলুসুয়াক এলাকায় ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে নিয়মিত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বাস্তব সামরিক দায়িত্বেও অংশ নিচ্ছে তারা। ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, এটাই সাম্প্রতিক সময়ে প্রথমবার কোনো বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার দলকে গ্রিনল্যান্ডে পাঠানোর ঘটনা।

গ্রিনল্যান্ডের ভিন্ন ও দুর্গম পরিবেশে সৈন্যদের যুদ্ধ ও টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ানোই এই মোতায়েনের অন্যতম উদ্দেশ্য। গাছপালাহীন বিস্তীর্ণ প্রান্তর, খাড়া পাথুরে ঢাল এবং প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে তাদের চলাচল, অবস্থান নির্ধারণ, আড়াল নেওয়া ও প্রতিকূল ভূখণ্ডকে সামরিক সুবিধায় ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে খোলা ভূখণ্ডে শত্রুর নজর এড়িয়ে চলা এবং ইউনিটের অবস্থান সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সৈন্যদের প্রশিক্ষণ চলছে ‘আর্কটিক এন্ডুরেন্স’ সামরিক মহড়ার আওতায়। ডেনমার্কের সেনাবাহিনীর ভাষ্য, এই মহড়ার মাধ্যমে শুধু সৈন্যদের প্রশিক্ষণ নয়, আর্কটিক অঞ্চলে দীর্ঘ সময় কার্যকরভাবে সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে। মহড়াটি গ্রিনল্যান্ড সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হচ্ছে এবং ২০২৬ সালজুড়ে এর কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি ২০২৭ সালেও আর্কটিকে সামরিক উপস্থিতি ও মহড়া আরও জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।

কোম্পানি কমান্ডার ক্যাপ্টেন লরা জেপসেনের মতে, গ্রিনল্যান্ডের ভূপ্রকৃতি ডেনমার্কের মূল ভূখণ্ডের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে সৈন্যদের জানতে হচ্ছে কীভাবে বিস্তীর্ণ ও উন্মুক্ত এলাকায় নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে হয়, ভূখণ্ড কাজে লাগাতে হয় এবং নিজেদের ও অন্য ইউনিটের অবস্থান নির্ভুলভাবে নির্ণয় করতে হয়। এ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আর্কটিক পরিবেশে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আর্কটিকে সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে এরই মধ্যে বড় ধরনের বিনিয়োগের পথে হাঁটছে ডেনমার্ক। ২০২৫ সালে দেশটি গ্রিনল্যান্ড ও উত্তর আটলান্টিকের নিরাপত্তা জোরদারে মোট ৮৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ড্যানিশ ক্রোনার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আওতায় নতুন আর্কটিক জাহাজ, সামুদ্রিক টহল বিমান, দীর্ঘপাল্লার চালকবিহীন বিমান, উপগ্রহ নজরদারি, আকাশ নজরদারি রাডার, বরফভাঙা সক্ষমতা ও বিশেষায়িত আর্কটিক ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের নুকে আর্কটিক কমান্ডের নতুন সদর দপ্তরও স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ ছাড়া ডেনমার্ক আরও ১৬টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে দেশটির মোট এ ধরনের যুদ্ধবিমানের সংখ্যা ৪৩-এ দাঁড়াবে। আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিকে দীর্ঘপাল্লার সামরিক তৎপরতায় সহায়তার জন্য আকাশে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতাও গড়ে তোলা হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই দুটি ডেনিশ এফ-৩৫ ও একটি ফরাসি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান দক্ষিণ-পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে যৌথ প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেছে।

গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে সামরিক তৎপরতা এখন ন্যাটোর বৃহত্তর আর্কটিক পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ন্যাটো ‘আর্কটিক সেন্ট্রি’ নামে নতুন সামরিক কার্যক্রম শুরু করে। এর লক্ষ্য আর্কটিক ও উত্তরাঞ্চলে নজরদারি, প্রতিরোধ সক্ষমতা এবং জোটের সদস্যদের দ্রুত সামরিক সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো। ডেনমার্কের ‘আর্কটিক এন্ডুরেন্স’ মহড়াও এই উদ্যোগের অংশ। ন্যাটোর আটটি আর্কটিক দেশের মধ্যে সাতটিই জোটের সদস্য হওয়ায় অঞ্চলটির নিরাপত্তাকে এখন জোটের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আর্কটিকে ন্যাটোর এই তৎপরতা নিয়ে রাশিয়ার উদ্বেগও তীব্র হচ্ছে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ সম্প্রতি ন্যাটোর বাড়তি সামরিক কার্যক্রমকে রাশিয়ার জন্য ‘সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মস্কোর সামরিক উপস্থিতি আর্কটিকে সবচেয়ে শক্তিশালী। পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিনসহ রাশিয়ার উল্লেখযোগ্য সামরিক অবকাঠামো রয়েছে সেখানে। উত্তর মেরু ঘিরে নতুন সমুদ্রপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্ব বাড়ায় অঞ্চলটি রাশিয়ার কৌশলগত পরিকল্পনায়ও বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

অন্যদিকে আর্কটিকের খনিজ সম্পদ, জ্বালানি ও নতুন নৌপথকে ঘিরে চীনের আগ্রহও বাড়ছে। বেইজিং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মস্কোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়ে অঞ্চলটিতে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলার প্রবণতা বাড়ায় নতুন নৌপথ ব্যবহারের সম্ভাবনা এবং বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে আর্কটিক এখন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ন্যাটোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

এদিকে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ওয়াশিংটন-কোপেনহেগেন টানাপোড়েন পুরোপুরি শেষ হয়নি। গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিউট এগেদে জানিয়েছেন, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের মতামতই গুরুত্বপূর্ণ—এ অবস্থানও বারবার স্পষ্ট করেছে গ্রিনল্যান্ডের নেতৃত্ব। ফলে নতুন করে ডেনমার্কের বাধ্যতামূলক সৈন্য মোতায়েনকে শুধু প্রশিক্ষণ নয়, আর্কটিকে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান শক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।