দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা হামলার ৮১তম বার্ষিকী পালন করেছে জাপান। বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে হামলায় নিহতদের স্মরণ করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্ব থেকে সব ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র বিলুপ্ত করার আহ্বান জানিয়েছে জাপান।
জাপানের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে জানিয়েছে, হিরোশিমার শান্তি স্মৃতি উদ্যানে এ উপলক্ষে বার্ষিক স্মরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে অংশ নেন। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।এবার রেকর্ড ১২৩টি দেশ ও অঞ্চলের প্রতিনিধি এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তারা সবাই পারমাণবিক বোমা হামলায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বোমা হামলায় নিহতদের হালনাগাদ নামের তালিকা শান্তি স্মৃতিস্তম্ভের ভেতরে সংরক্ষণ করা হয়। এনএইচকের তথ্য অনুযায়ী, এই তালিকায় এখন মোট ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৯ জনের নাম রয়েছে।
.গত এক বছরে মারা যাওয়া বোমা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের নামও এবার তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।সকাল ঠিক ৮টা ১৫ মিনিটে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট ঠিক এই সময়েই যুক্তরাষ্ট্র হিরোশিমা শহরের ওপর বিশ্বের প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে হিরোশিমায় এই হামলা ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র শহরটির ওপর ইউরেনিয়ামভিত্তিক পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে।
বোমাটির সাংকেতিক নাম ছিল ‘লিটল বয়’। ভয়াবহ বিস্ফোরণ, তীব্র তাপ এবং তেজস্ক্রিয়তার কারণে পুরো শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ বিস্ফোরণের সরাসরি প্রভাব, আগুনে দগ্ধ হওয়া এবং তেজস্ক্রিয়তার কারণে আনুমানিক ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
.এর মাত্র তিন দিন পর, ৯ আগস্ট, যুক্তরাষ্ট্র জাপানের আরেক শহর নাগাসাকিতে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ফেলে। সেই বোমার সাংকেতিক নাম ছিল ‘ফ্যাট ম্যান’। এরপর ১৫ আগস্ট ১৯৪৫ সালে জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়েই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। হিরোশিমা ও নাগাসাকির পারমাণবিক হামলা থেকে জীবিত ফিরে আসা মানুষদের জাপানে ‘হিবাকুশা’ নামে ডাকা হয়। এনএইচকের তথ্য অনুযায়ী, এসব মানুষ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। তাদের অনেকেই ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত জাপানে প্রায় ৯১ হাজার হিবাকুশা জীবিত ছিলেন। তাদের গড় বয়স এখন ৮৬ বছর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে।
হিবাকুশারা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবিতে প্রচার চালিয়ে আসছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। এনএইচকে জানায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এছাড়া পশ্চিম এশিয়ায় চলমান উত্তেজনার মধ্যে মে মাসে অনুষ্ঠিত পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) পর্যালোচনা সম্মেলনও কোনো চূড়ান্ত নথি গ্রহণ করতে পারেনি।
ফলে বিশ্বে পারমাণবিক ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হিরোশিমার বার্ষিক স্মরণ অনুষ্ঠান থেকে আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি পারমাণবিক অস্ত্র পুরোপুরি বিলুপ্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সব দেশের সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে জাপান।