ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশিতে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে এক বিশাল ও যুগান্তকারী মাইলফলক স্পর্শ করল পাকিস্তান। চিরবৈরী ভারতের চোখ রাঙানি এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই পাকিস্তান নৌবাহিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলো চতুর্থ প্রজন্মের অত্যাধুনিক ‘হ্যাঙ্গর-ক্লাস’ সাবমেরিন।
চীনের সাথে সম্পাদিত শতকোটি ডলারের এক মেগা চুক্তির আওতায় নির্মিত এই সাবমেরিন অন্তর্ভুক্তিকে পাকিস্তানের নৌ-প্রতিরক্ষা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রূপান্তর হিসেবে দেখছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের ফলে পাকিস্তানের নৌবাহিনী এখন আর কেবল উপকূল রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সমুদ্রের অতল গভীরে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের এই নতুন হ্যাঙ্গর-ক্লাস সাবমেরিনগুলো মূলত সমুদ্রের নিচে এক-একটি নিখুঁত ও বিধ্বংসী চালক। চরম প্রতিকূল যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নিজেদের রাডার ও সোনারের আড়ালে রেখে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অভিযান পরিচালনায় এটি পারদর্শী। শুধু তাই নয়, অস্ত্রশস্ত্রে এটি এতটাই আধুনিক যে একে সমুদ্রের নিচে আস্ত এক ‘ভাসমান অস্ত্রাগার’ বলা চলে।
সমুদ্রের গুপ্ত অবস্থান থেকে শত্রুপক্ষের ভূখণ্ডের অনেক গভীরে কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে মারাত্মক আঘাত হানতে সক্ষম এই সাবমেরিন। সামরিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘সেকেন্ড-স্ট্রাইক’ বা পাল্টা আঘাতের ক্ষমতা। শত্রুপক্ষ যদি প্রথমে আক্রমণও করে বসে, তবে সমুদ্রের নিচে ওত পেতে থাকা এই সাবমেরিনগুলো এমন পাল্টা আঘাত হানবে যা শত্রুর পুরো যুদ্ধকৌশল ও হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দেবে। এর দীর্ঘ সময় পানির নিচে ডুবে থাকার ক্ষমতা ও বহুমাত্রিক অস্ত্রের লেথালিটি (মারাত্মক ক্ষমতা) পুরো থিয়েটার-লেভেল বা যুদ্ধক্ষেত্রের ফলাফল বদলে দিতে পারে।
এই ঐতিহাসিক অর্জন সম্ভব হয়েছে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের মিত্র চীনের হাত ধরে। জানা গেছে, চীনের সাথে সম্পাদিত শতকোটি ডলারের এই ঐতিহাসিক চুক্তির আওতায় মোট আটটি সাবমেরিন তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে চারটি তৈরি হচ্ছে চীনে এবং বাকি চারটি তৈরি করা হচ্ছে প্রযুক্তির পূর্ণ হস্তান্তরের মাধ্যমে পাকিস্তানের নিজস্ব ‘করাচি শিপইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস’ (কেএসইডাব্লিউ)-এ। এটিকে পাক-চীন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রকল্পে চীনের কাছ থেকে প্রযুক্তি পাওয়ার বিষয়টি পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। সাবমেরিন নির্মাণ করা সাধারণ যুদ্ধজাহাজ তৈরির চেয়ে বহুগুণ জটিল ও উচ্চ প্রযুক্তির কাজ। এর জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত শক্তিশালী বিশেষ ইস্পাত মিশ্রণ, শব্দহীনভাবে চলার প্রযুক্তি, নিখুঁত প্রপালশন বা চালনা ব্যবস্থা এবং পানির প্রচণ্ড চাপ সহ্য করার মতো লাইফ-সাপোর্ট সিস্টেম। এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে পাকিস্তান চীনের কাছ থেকে সেই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিজেদের আয়ত্তে আনছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে পাকিস্তানের নিজস্ব প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান ও নেভাল আর্কিটেক্টদের এক নতুন প্রজন্ম, যারা ভবিষ্যতে দেশের মাটিতেই সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে সাবমেরিন নির্মাণ কর্মসূচির মূল চালিকাশক্তি হবে। করাচি শিপইয়ার্ডকে এই উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ আধুনিকায়ন করা হয়েছে, যা পাক-চীন দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
এই নতুন নৌবহরের ‘হ্যাঙ্গর’ নামটি পাকিস্তানের সামরিক ইতিহাসে অত্যন্ত আবেগ ও গৌরবের প্রতীক। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক যুদ্ধে পাকিস্তানের তৎকালীন সাবমেরিন ‘পিএনএস হ্যাঙ্গর’ ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘আইএনএস খুকরি’-কে সমুদ্রের বুকে ডুবিয়ে দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে সাবমেরিন দিয়ে কোনো শত্রু যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার সেটাই ছিল প্রথম ও একমাত্র ঘটনা, যা বিশ্বমঞ্চে পাক নৌবাহিনীর মর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। নতুন বহরের নামকরণ সেই গৌরবময় ইতিহাসকে ধারণ করেই করা হয়েছে, যা বর্তমান নৌবাহিনীর রণকৌশল ও মনোবলকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
হ্যাঙ্গর-ক্লাস সাবমেরিনের এই জমকালো অন্তর্ভুক্তি পুরো পাকিস্তান জুড়ে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। দেশটির শীর্ষ রাজনীতিবিদ, মূলধারার গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই অর্জন নিয়ে গভীর গর্ব প্রকাশ করছেন। রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা ভাবনায় এক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এনেছে। সাধারণত পাকিস্তান সর্বদা ভারত ও আফগানিস্তানের স্থল সীমান্ত নিয়ে ব্যস্ত থাকে; কিন্তু এই সাবমেরিনের আগমন দেশের নিরাপত্তা চেতনাকে সফলভাবে আরব সাগরের নীল জলরাশির দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।
১৯৭১ সালের পর সম্ভবত এবারই প্রথম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ও নীতিনির্ধারকেরা গভীরভাবে উপলব্ধি করছেন যে, তাদের নৌবাহিনী কেবল একটি উপকূল রক্ষী বাহিনী বা প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল নয়। বরং এটি এখন সমুদ্রের শান্ত অথচ নির্মম গভীরতা থেকে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সক্ষম এক মহাশক্তিশালী এবং অপরাজেয় ‘নীরব প্রহরী’।