যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর ১০ দিন কেটে গেছে। এর মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনিকে হত্যা ও তেহরানে ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়া দেশটিকে এখনও বাগে আনতে পারেনি তারা। উল্টো ইরানের শক্ত প্রত্যাঘাতে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে। বাড়ছে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ।এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ শেষ করতে দেশের ভেতরে ও বাইরে ক্রমশ চাপ বাড়ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর। অথচ দম্ভ নিয়ে যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দিলেও এর অবসান কীভাবে ও কবে হবে, তা ব্যাখ্যা করতে পারছেন না তিনি; যা নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই।গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক প্রতিবেদক স্টিফেন কলিসনের লেখা এক নিবন্ধে ট্রাম্পের এই নীতির কড়া সমালোচনা করা হয়েছে।এতে বলা হয়, ট্রাম্প সারাজীবন কঠিন পরিস্থিতি থেকে নিজের যুক্তি দিয়ে বেরিয়ে এসেছেন। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ক্ষেত্রে সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য তাঁর সেই চেনা কৌশল, অর্থাৎ বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সময়ক্ষেপণ এখন আর কাজ করছে না। যুদ্ধ শুরুর পর ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও ট্রাম্প এখনও যুদ্ধের যৌক্তিক কারণ নিয়ে কোনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।
এখন তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন, শান্তি হয়তো খুব কাছেই। অথচ একই সময়ে তিনি এবং তাঁর শীর্ষ সহযোগীরা সতর্ক করছেন, যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।নিবন্ধে ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলা হয়, এমনিতেই ট্রাম্পের কথা বলার ধরন অগোছালো এবং নিজের কাজের ওপর নিজেই মন্তব্য করার অদ্ভুত স্বভাব আছে। কিন্তু তাতে এবার তিনি পার পাচ্ছেন না। প্রেসিডেন্টের ওপর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের প্রতিফলন পড়ছে তাঁর কর্তাবার্তায়। কারণ, তিনি এমন এক যুদ্ধে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাজি রেখেছেন, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে।শেয়ারবাজারে ধস এবং তেলের দাম বৃদ্ধি এমন আশঙ্কা তৈরি করেছে এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে ভেঙে ফেলতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বৃহত্তর যুদ্ধের ভীতিও বাড়িয়ে দিয়েছে।দিন যত যাচ্ছে, ট্রাম্পের যুদ্ধের উদ্দেশ্য যত অস্পষ্টই হোক না কেন, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যেন আরও বেশি সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। কারণ জনমত জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন জনগণ কখনোই আর কোনো নতুন যুদ্ধে জড়াতে চায়নি। তাই গত সোমবার ট্রাম্প আমেরিকানদের কাছে আবারও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, কেন তাদের সৈন্যরা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ করছে।
ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন, তিনি যদি ইরানের ওপর হামলা না চালাতেন, তাহলে দেশটি পুরো মধ্যপ্রাচ্য দখল করে নিত। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইরান যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়, তাহলে তা ইসরায়েলসহ সারাবিশ্বের জন্য একটি অস্তিত্বের সংকট তৈরি করবে। কিন্তু ইরান যে সেই পর্যায়ের কাছাকাছি ছিল, তার কোনো প্রমাণ ট্রাম্প দেখাতে পারেননি।অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার একটি কারণ হলো, ইরান তার প্রায় ৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় ছিল। ইসরায়েল ইতোমধ্যেই তাদের আঞ্চলিক প্রতিনিধি হামাস ও হিজবুল্লাহকে কোণঠাসা করে ফেলেছিল এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল।তবে ট্রাম্প সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন, আমেরিকানদের ধৈর্যের সীমা আছে। সিএনএনের নিবন্ধে বলা হয়, চলমান যুদ্ধ নিয়ে একটি কঠিন প্রশ্নের উত্তর ট্রাম্পকে দিতেই হবে। কারণ ট্রাম্পের যুদ্ধের অস্পষ্ট বয়ান মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর অবিরাম বিমান হামলার সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত।প্রথমত যুক্তরাষ্ট্রকে মূল্যায়ন করতে হবে, তাদের সামরিক সাফল্য ইরানের সক্ষমতাকে যথেষ্ট পরিমাণে কমাতে পেরেছে কিনা। যাতে তারা প্রতিবেশী দেশ, ইউরোপে থাকা মিত্র এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন মূল ভূখণ্ডের জন্য হুমকির কারণ না হয়। দুই, এই অর্জন কি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্তিত্বের সংকটকে দূরে ঠেলে দিতে পারবে কিনা। এবং ট্রাম্প কি ইরানের শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে সরে আসতে রাজি?