৪৫তম বিসিএসের প্রজ্ঞাপনে বাদ পড়েছেন চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত ৫৫ জন প্রার্থী। আর ৫০ জন প্রার্থী স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশ নেননি। গত বুধবার রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক হাজার ৭০২ জনের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে। এর পর থেকেই বাদ পড়া প্রার্থীরা হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ শুরু করেন। অনেকেই জানতে চাইছেন কোন কারণে তাদের নিয়োগ দেওয়া হলো না।গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রজ্ঞাপন থেকে বাদ পড়া প্রার্থীরা। তাদের দাবি, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রজ্ঞাপন প্রকাশের সময় এভাবে বাদ পড়ার কারণ জানার অধিকার তাদের রয়েছে। প্রার্থীরা পুনঃপ্রজ্ঞাপন প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। আগামীকাল শনিবার সকাল ১০টার মধ্যে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত না এলে আত্মাহুতির হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সুমি আক্তার টানা তিন বিসিএসে ব্যর্থ হওয়ার পর ৪৫তম বিসিএসে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডারে মেধাক্রমে ১১তম হয়ে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছিলেন। কিন্তু গত বুধবার প্রকাশিত গেজেটে তাঁর নাম নেই। সুমি অবশ্য ৪৬তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে ৬৭তম মেধাক্রমে সুপারিশ পেয়েছেন। তারপরও ৪৫তম বিসিএসের গেজেট থেকে বাদ পড়ার ঘটনায় তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্টে সুমি লিখেছেন, সাত বছরের সাধনা, অসংখ্য নির্ঘুম রাত ও ব্যক্তিগত ত্যাগের পর রাষ্ট্রের কাছ থেকে তাঁর প্রাপ্তি যেন উপেক্ষা। তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। নিজের পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া এবং ৯ মাসের শিশুসন্তানকে সুন্দর ভবিষ্যৎ দেওয়ার স্বপ্নও ছিল তাঁর।
মেধাক্রম ২৮, তবু গেজেটে নাম নেই
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মনিরুজ্জামান ৪৫তম বিসিএসে মৎস্য ক্যাডারে মেধাক্রমে ২৮তম হয়ে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছিলেন। পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশে নাম থাকলেও গেজেটে নাম না থাকায় ভেঙে পড়েছেন তিনি।গত বুধবার রাতে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নিজের হতাশার কথা তুলে ধরেন মনিরুজ্জামান। তিনি জানান, দীর্ঘ পাঁচ বছরের অপেক্ষা ও প্রস্তুতির পর বিসিএসের সব ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছিলেন। তাঁর বাবা-মা সাধারণ মানুষ। ছেলেকে বিসিএস ক্যাডার হিসেবে দেখার স্বপ্ন নিয়ে তারা অপেক্ষা করছিলেন।
পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে গেল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী চিন্ময় বর্মণের স্বপ্ন ছিল পুলিশ ক্যাডারে যোগ দিয়ে পরিবারের অভাব দূর করা। তাঁর বাবা নদীতে মাছ ধরে সংসার চালান। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ছেলের পড়াশোনা নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখেছিলেন মা-বাবা। চিন্ময়ও স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পড়াশোনার পাশাপাশি বিসিএসের প্রস্তুতি চালিয়ে গেছেন। ৪৫তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ পাওয়ার পর পরিবারে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল।কিন্তু গত বুধবার রাতে গেজেট প্রকাশের পর সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর গেজেট প্রকাশের খবর পেয়ে চিন্ময় ও তাঁর স্ত্রী একসঙ্গে তালিকায় নাম খুঁজছিলেন। বারবার অনুসন্ধান করেও নাম না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর স্ত্রী।চিন্ময় জানান, তাঁর নামে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই। রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও নেই। তাঁর কিংবা পরিবারের কারও রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। তাহলে কী কারণে তাঁর নাম গেজেটে নেই সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তিনি।
সরকারি ব্যাংকে চাকরি করেও হতাশ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী একরাম গাজী বর্তমানে একটি সরকারি ব্যাংকে কর্মরত। ৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েও গেজেটে নাম না থাকায় হতাশ হয়েছেন তিনি।একরামের দাবি, কোনো মামলা ছাড়াই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একজন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
কেন বাদ পড়লেন ৫৫ জন?
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রকাশিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ৪৫তম বিসিএসে এক হাজার ৭০২ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারের প্রবেশ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারে ২৬৬ জন, পুলিশ ক্যাডারে ৭১ জন এবং পররাষ্ট্র ক্যাডারে ৯ জন রয়েছেন। তাদের নবম গ্রেডে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী নবম গ্রেডের বেতন ৪৪ হাজার থেকে এক লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা।এর আগে পিএসসি এক হাজার ৮০৭ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল। তাদের মধ্যে ১০৫ জনের নাম চূড়ান্ত গেজেটে আসেনি। তাদের মধ্যে ৫০ জন স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশ নেননি। ৫৫ জন বাদ পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, প্রার্থীদের ভেরিফিকেশন নিয়ে নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্তের কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়েছিল। একটি গোয়েন্দা সংস্থা গত জুলাইয়ে ভেরিফিকেশন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর আরেকটি সংস্থার মাধ্যমে পুনরায় যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে কোন প্রার্থীর ক্ষেত্রে কী কারণে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত এসেছে, তা স্পষ্ট নয়।৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর। দুই হাজার ৩০৯টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় তিন লাখ ৪৬ হাজার প্রার্থী। ২০২৩ সালের ১৯ মে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেন দুই লাখ ৬৮ হাজার ১১৯ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হন ১২ হাজার ৭৮৯ জন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়; এতে উত্তীর্ণ হন ছয় হাজার ৫৫৮ জন। মৌখিক পরীক্ষা শেষে ২০২৫ সালের নভেম্বরে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে পিএসসি এবং এক হাজার ৮০৭ জনকে সাময়িকভাবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়।জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গেজেটভুক্ত প্রার্থীদের আগামী ১ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগ নির্ধারিত কার্যালয়ে যোগদান করতে হবে। তাদের বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অথবা সরকার নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে হবে।