এখন একই সময়ে একাধিক ভাইরাস মানুষের দেহে শনাক্ত হচ্ছে। ডেঙ্গু, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা, চিকুনগুনিয়া, রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের প্রভাবে চারদিকে জ্বর দেখা দিচ্ছে।ফলে জ্বরকে আর সাধারণ উপসর্গ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও আগে থেকে অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে একই উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর শরীরে একাধিক ভাইরাস শনাক্ত হচ্ছে। রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসক একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়ায় রোগী ও স্বজনদের আর্থিক চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল হাতে না আসা পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগের সামনে রোগীর সারি। সকাল থেকেই পাঁচটি কাউন্টারে চিকিৎসকরা রোগী দেখছিলেন। কোথাও মায়ের কোলে জ্বরে কাতর শিশু। কোনো কোনো শিশুর শ্বাসকষ্ট, আবার কেউ এসেছে ডায়রিয়া নিয়ে। কারও জ্বরের সঙ্গে শরীরজুড়ে র্যাশ। আবার কারও তীব্র শরীর ব্যথা কিংবা সর্দি-কাশি।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, এক মাস আগেও প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত মেডিসিন বহির্বিভাগে গড়ে ২৫০ থেকে ২৭০ রোগী আসত। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫০ থেকে ৪৬০ এ। জরুরি বিভাগসহ দুই বিভাগে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের ৬ থেকে ৮ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হচ্ছে। ভর্তি রোগীর বড় অংশের বয়স শূন্য থেকে ৫ বছর।হাসপাতালের বহির্বিভাগের চিকিৎসক এবিএম মাহফুজ হাসান আল মামুন বলেন, বেশির ভাগ শিশু জ্বর, শরীরে র;্যাশ ও ডায়রিয়া নিয়ে আসছে। অনেকের ডেঙ্গু পরীক্ষায় শনাক্ত না হলেও ডেঙ্গুর উপসর্গ রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা করতে হচ্ছে। প্রায় ৫ শতাংশ রোগীকে ভর্তি করতে হচ্ছে।টঙ্গী থেকে ১৮ মাসের সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন হুমায়রা ইসলাম। তাঁর সন্তানের এক সপ্তাহ ধরে জ্বর। বিভিন্ন পরীক্ষা করিয়েও জ্বরের কারণ জানা যায়নি। চিকিৎসকরা শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। তবে শয্যা না থাকায় তাঁকে অন্য হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। আগারগাঁও থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে এসেছেন নাহিদা আক্তার। ছোট মেয়ের জ্বর সেরেছে তিন দিন আগে। এর মধ্যেই জ্বরে ধুঁকছে বড় মেয়ে। ডেঙ্গু বা হাম হতে পারে এমন শঙ্কা থেকেই হাসপাতালে এসেছেন তিনি।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ডেঙ্গু সব বয়সী মানুষের হতে পারে। হাম মূলত ছোটদের বেশি দেখা গেলেও দুটি রোগই শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু জ্বরের সময় শরীরে র্যাশ দেখা দিতে পারে। হামের ক্ষেত্রে সাধারণত জ্বরের পর র্যাশ শুরু হয়, ধীরে ধীরে র্যাশ শরীরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে চোখ, মেরুদণ্ডসহ শরীর ব্যথা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। মৌসুমি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে সাধারণত এ ধরনের তীব্র ব্যথা থাকে না। ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণ ও শকে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। হামের বড় জটিলতা নিউমোনিয়া। আর ইনফ্লুয়েঞ্জায় হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও নাক বন্ধ থাকার প্রবণতা বেশি। অর্থাৎ, জ্বর একই হলেও রোগ এক নয়। আর এখানেই চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডে প্রতিদিনই নতুন রোগী ও মৃত্যুর তথ্য যুক্ত হচ্ছে। আগস্টের মাঝামাঝি এক দিনে ৭৫৩ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই দিন তিনজনের মৃত্যু হয়। তখন চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ২৫ হাজার ৬০১ এবং মৃত্যু ৭৪-এ পৌঁছেছিল। আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, দেশের ১২টি সাইট থেকে সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও দক্ষিণাঞ্চলে ডেঙ্গুর ডেন-২ ভাইরাসের প্রকোপ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ডেন-৩ এবং মিশ্র ডেঙ্গু সংক্রমণও দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, এ বছর সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার চেয়ে আরএসভির প্রকোপও অস্বাভাবিক বেশি। ডেঙ্গুর ধরনবিষয়ক গবেষণা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আগামী মঙ্গলবার প্রকাশ হতে পারে।
ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়া রোগীও মিলছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, অনেক রোগীর জ্বর কমে গেলেও শরীর ব্যথা সপ্তাহের পর সপ্তাহ থাকছে। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর শরীরে তীব্র ব্যথা হওয়ায় হাঁটা-চলায় সমস্যা হতে পারে। কারও কারও চোখমুখ ফুলে যায়। তিনি বলেন, জ্বর হলে নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়া কিংবা ইন্টারনেট ঘেঁটে চিকিৎসা শুরু করা বিপজ্জনক। রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ার পর হাসপাতালে এলে চিকিৎসার সুযোগও সংকুচিত হয়ে যায়।বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, দেশে সাধারণত মার্চ-এপ্রিল এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ে। এ বছর মার্চ-এপ্রিলের পর সংক্রমণ কিছুটা কমলেও পরে আবার বেড়েছে। তাঁর ভাষায়, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস একই সময়ে ছড়াচ্ছে। এর মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা এখন প্রধান কারণ। ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-এ ও টাইপ-বি দুটিই উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় শনাক্ত হচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরে গণপরিবহন, স্কুল-কলেজ ও জনসমাগমের স্থানে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাস ছড়াচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। এর মধ্যে দেশে হামের সংক্রমণও অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের বুলেটিন অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৬১ জন। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে তিনজন এবং হাম শনাক্ত হওয়ার পর আরও একজন মারা গেছে।