ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়ালশীর্ষ ১০ ব্যয়বহুল শহরের তালিকা থেকে বাদ পড়ল দুবাইইরানে বিমানবন্দর ও সেতুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, নিহত ৮বাড়তে পারে মন্ত্রিসভার আকার, আলোচনায় দেড় ডজন নামআজ মুখোমুখি ইংল্যান্ড-ফ্রান্স
No icon

পাঁচ জেলায় চার কারণে দুই শতাধিক পাহাড়ধস

চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে দুই শতাধিক। ৫ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দিনে পাহাড়ধসের বলি হয়েছেন ২৬ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজারে।এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার শিকার ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছিল পাহাড়ের ঢালুতে। কাটা পাহাড়ের নিচে। বৃষ্টিতে পাহাড়ের অংশবিশেষ ধসে সেগুলো চাপা পড়ে। এতে প্রাণহানি হয়। এসব মৃত্যু ঠেকাতে প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, পাহাড় কাটার তথ্য তাদের কাছে ছিল না।গবেষকরা বলছেন, মূলত চারটি প্রধান কারণে এ বিভাগে পাহাড়ধসের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। কারণগুলো হলো পাহাড়গুলোর ভূতাত্ত্বিক মাটির গঠন মূলত বালু, পলি ও নরম কাদার মিশ্রিত হওয়ায় অতিবৃষ্টিতে দুর্বল হয়ে ধসে পড়ে; আদি জুমচাষের রূপান্তর ও বন উজাড় করা; ভূতাত্ত্বিক জরিপ ছাড়া পাহাড় কেটে সরকারি-বেসরকারিভাবে উন্নয়ন এবং পাহাড়ের প্রাকৃতিক বিন্যাস ধ্বংস করা।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে গবেষকদের দাবির সত্যতা পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম নগরের চশমা হিল আবাসিকের শেষ প্রান্তে আমিন আহমদ চৌধুরীর মালিকানাধীন 
পাহাড়টি প্রায় ৬০ ফুট খাড়াভাবে কাটা হয়। ওই পাহাড়ের নিচে তৈরি করা হয় আবদুল জব্বার কলোনি। ভারী বৃষ্টিতে ৮ জুলাই পাহাড়টির অংশবিশেষ ধসে পড়ে ওই কলোনির একটি টিনের ঘরের ওপর। এতে চাপা পড়ে প্রাণ হারায় সুমাইয়া আক্তার।একই দিন ৮ জুলাই সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের বাগানবাড়ি এলাকার খাস পাহাড়ধসে আশরাফুল ইসলাম তানভীর নামে ছয় মাসের শিশুর মৃত্যু হয়। পাহাড়টি কেটে জনবসতি তৈরি করেছিলন মঈন উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি। ৩০-৪০ ফুট উঁচু পাহাড়টির ঢাল কেটে ঘরে নির্মাণ করা হয়েছিল। এ দুটি ঘটনাস্থলে পাহাড় কাটার তথ্য পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে ছিল না। আগাম কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।কক্সবাজারে মাত্র পাঁচ দিনে ১৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে ৫ জুলাই উখিয়া রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড়ধসে আটজনের মৃত্যু হয়। একই দিন কক্সবাজার সদরে একজন ও পেকুয়ায় একজনের মৃত্যু হয়। ৮ জুলাই উখিয়া আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে পাঁচ শিশু শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। পরদিন ৯ জুলাই চকরিয়ায় মৃত্যু হয় দুজনের।

রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, উখিয়ায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে থাকা পাহাড়গুলো নিজেদের মতো করে কেটে গর্ত করে বসতঘর তৈরি করে রোহিঙ্গারা সেখানে অবস্থান করছিল। কাটা পাহাড়ের ঠিক নিচে বৃষ্টিতে কাটা পাহাড়ের অন্য অংশ ধসে ঘরসহ চাপা পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এদিকে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার লাইল্যাঘোনায় প্রায় ১০০ ফুট উঁচু পাহাড়ধসে লক্ষ্মী বিলাস চাকমা (৪০) প্রাণ হারান। নিজ মালিকানাধীন পাহাড় কেটে নিচে তৈরি করা গোয়ালঘরে গরুকে ঘাস খাওয়ানোর সময় ধসের ওই ঘটনা ঘটে। পাহাড়টির প্রাকৃতিক ঢাল ধ্বংস করে ঘরটি তৈরি করেছিলেন, আর সেখানেই চাপা পড়েন তিনি। বান্দরবানের লামার মিশনপাড়ায় পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন। তারা দুটি সরকারি খাস পাহাড় কেটে নিচে বসতি গড়েছিলেন। প্রশাসন বলছে, তাদের কাছে ওই পাহাড় কাটার তথ্য ছিল না।গত ৫ থেকে ১১ জুলাই এক সপ্তাহের বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে দুই শতাধিক। এর মধ্যে রাঙামাটিতে ১৩৫ বার ধসের ঘটনা ঘটেছে। প্রাণ গেছে দুজনের। বান্দরবানে ২৩ বার ধসে পাঁচজন, চট্টগ্রামে ৩৪ বার ধসে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। মূলত ইচ্ছামতো পাহাড় কেটে বসতি গড়ায় বেশি ধসের ঘটনা ঘটছে। খাড়াভাবে পাহাড় কাটায় ভারী বর্ষণে ধসে পড়ছে মাটি। গবেষকরা বলছেন, পাহাড়ের ঢালের প্রাকৃতিক বিন্যাস না বুঝে কাটা ও খোঁড়াখুঁড়ি করায় পাহাড়গুলোর গোড়া দুর্বল হয়ে পড়েছে। সেই ঝুঁকিপূর্ণ ঢালুতে বসতি তৈরি করায় রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে প্রাণহানি বাড়ছে।

পাহাড়ধস, ধস ব্যবস্থাপনা, পূর্বাভাস এবং ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সারওয়ার। তিনি বলেন, পাহাড়ি মাটি বালু, পলি ও নরম কাদার মিশ্রিত হওয়ায় আগের মতো গাছের শিকড়ের সঙ্গে শক্তভাবে আঁকড়ে থাকছে না। তাই ভারী বৃষ্টি হলেই পাহাড়ের ঢালে মাটি নেমে যাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান বলেন, চট্টগ্রামে দুর্ঘটনার শিকার দুটি পাহাড়ধসের স্থান পরিদর্শন করেছি। কারা পাহাড় কাটায় জড়িত অনুসন্ধান চলছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। পরিবেশ অধিদপ্তর রাঙামাটি জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মুমিনুল ইসলাম বলেন, রাঙামাটির পাহাড়গুলো নরম বেলে মাটির পাহাড়। এ কারণে ভারী বৃষ্টিতেই পাহাড়ধস হচ্ছে। ত্রাণ ও পুনর্বাসনের দায়িত্বে থাকা খাগড়াছড়ি জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হাসান মারুফ বলেন, পার্বত্যাঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে বসতি করা। জুমচাষ করতে গিয়ে পাহাড়ের গাছ শূন্য করে ফেলায় বৃষ্টি হলে সহজেই ধসে পড়ছে মাটি। রাঙামাটি জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, আগে এত পাহাড়ধস হতো না। এখন অতিরিক্ত ধসের ঘটনা ঘটছে।