তীব্র লোডশেডিংয়ের শঙ্কাজাতীয় নির্বাচনে সীমিত হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেনফের আসছে শৈত্যপ্রবাহ, বজ্র-শিলাবৃষ্টির আভাসচাঁদাবাজি বন্ধ হলে দেশ বদলে যাবে: জামায়াত আমির১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সব ব্যাংক বন্ধ
No icon

তীব্র লোডশেডিংয়ের শঙ্কা

আর কদিন পরই রমজান। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুম। এই সময়টায় দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, গ্যাস উৎপাদনের ধারাবাহিক পতন এবং বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতায় পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন, চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এ সময়টায় দেড় হাজার মেগাওয়াট থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হতে পারে, যা রমজানে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলা। গ্রীষ্মকাল ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়।আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরও তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকার আভাস পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের চাহিদা হবে ১৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, মার্চে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং এপ্রিল ও মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে।খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ উৎপাদকরা একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন বিল পরিশোধ না হওয়ায় জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা যাচ্ছে না।

ব্যাংকঋণের সুদ ও সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতা তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। অথচ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির ধারা অনুযায়ী দীর্ঘস্থায়ী অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক সংকট থেকে সৃষ্ট উৎপাদন ব্যাঘাতের দায় উৎপাদকদের ওপর চাপানো চুক্তি ও আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম  বলেন, সামনে রমজান ও গ্রীষ্মকাল আসছে।এ সময়টায় স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের ওপর চাপ বাড়ে এবং চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছি।তিনি বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো (আইপিপি) আমাদের পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের ছাড়া এই চাহিদা মোকাবেলা করা অসম্ভব। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দেবে, এই বিশ্বাস আমাদের আছে। আমরা সবাইকে নিয়েই পরিকল্পনা করছি। এপ্রিল-মে মাসে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগোচ্ছি।

গ্যাস সরবরাহ প্রসঙ্গে জহুরুল ইসলাম বলেন, পেট্রোবাংলার সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে প্রায় প্রতিদিনই সভা হচ্ছে। তারা আমাদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্যাস এলোকেশন দিয়েছে, তবে আমরা আরো বেশি গ্যাস চাই। আমদানি করা এলএনজি ও নিজস্ব উৎপাদনের গ্যাস যত বেশি পাওয়া যাবে, তত বেশি স্বস্তিতে থাকা যাবে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসানাত কালের কণ্ঠকে বলেন, রমজান, সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মকাল বিদ্যুতের চাহিদার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় বকেয়া বিল পরিশোধ করা না হলে জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছয় মাসেরও বেশি সময়ের বিল পরিশোধ হয়নি। ফলে উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণের সুদ দিতে গিয়ে চরম চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর।

ডেভিড হাসানাত বলেন, বেসরকারি খাতে মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল বিনিয়োগ দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই বিপুল বিনিয়োগের পরও বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। পৃথিবীর কোথাও এভাবে চুক্তিভিত্তিক পাওনা আটকে রাখা হয় না। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে যারা প্রকৃতপক্ষে ভুল করেছে, তাদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যেত। সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদনে সংকট : বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে গ্রিডভিত্তিক মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ২০৪ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক সাত হাজার ২০৩ মেগাওয়াট, ফার্নেস অয়েল পাঁচ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট, ডিজেল ৭৬৮ মেগাওয়াট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে এক হাজার ৫৯ মেগাওয়াট ও আমদানি করা বিদ্যুৎ দুই হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট।তবে বাস্তবে এই সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। গ্যাস, কয়লাসহ কোনো জ্বালানি উৎস থেকেই পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে গ্যাসসংকট সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে। পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। আন্তর্জাতিক কম্পানি শেভরনের উৎপাদনও কমতির দিকে। সরকার চাইলে বাড়তি এলএনজি আমদানি করে উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনাও নেই। কারণ দুটি এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা মাত্র এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে সরকার চাইলেই বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাড়তি গ্যাস সরবরাহের সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশে গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে এবং উৎপাদন বাড়াতে নেওয়া আগের উদ্যোগগুলো কার্যকর হয়নি। এর ফলে সামনে আরো বড় গ্যাসসংকট দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পড়বে।তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের বিল বকেয়া রয়েছে। বর্তমান সরকার বকেয়াগুলো যাচাই করছে এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে অনিয়ম না থাকলে বিল পরিশোধে দেরি করা উচিত নয়। সরকার আদানিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধ করলেও দেশীয় উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে একই ন্যায়সংগত আচরণ প্রয়োজন।