যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট দলীয় কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের ওয়াশিংটন ডিসির বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। সোমবার ভোরে আদালতের অনুমোদন নেওয়া পরোয়ানার ভিত্তিতে এ অভিযান চালানো হয়। মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে, চলমান একটি কেন্দ্রীয় তদন্তের অংশ হিসেবে এ তল্লাশি চালানো হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্ত সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তির ভাষ্য, সম্ভাব্য অভিবাসন জালিয়াতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের একটি অংশে রয়েছে ওমরের অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্র, যা তিনি শিশু থাকাকালে তাঁর প্রয়াত বাবা পূরণ করেছিলেন। তবে তদন্তের বিস্তারিত বা অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত ইলহান ওমর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করতে মার্কিন সরকারকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, গত ১০ বছর ধরে ট্রাম্প তাঁর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ ও অপপ্রচার চালিয়ে আসছেন। ওমর এ অভিযানকে রাজনৈতিকভাবে ভয় দেখানোর প্রচেষ্টার সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে তিনি চুপ থাকবেন না বলেও জানান।
সোমবার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ইয়ংস্টাউনে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে ওমরকে নিয়ে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া ওমর ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পান। পরে তিনি মিনেসোটায় বসবাস শুরু করেন, যেখানে সোমালি বংশোদ্ভূত মানুষের একটি বড় জনগোষ্ঠী রয়েছে।
ট্রাম্প সমাবেশে সোমালিয়া সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। এ সময় উপস্থিত লোকজন ‘বহিষ্কার করো’ বলে স্লোগান দেন। ট্রাম্প তাঁর সমর্থকদের রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মিনেসোটার মতো ওহাইকেও লুটপাট ও ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হবে।
মার্কিন বিচার বিভাগের এক মুখপাত্র জানান, সোমবার ওয়াশিংটন ডিসি এলাকায় স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা তদন্ত বিভাগের কর্মকর্তারা বিচার বিভাগের অনুমোদন নেওয়া তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করেছেন। বিভাগটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসিইর একটি অংশ।
ট্রাম্পের নিয়োগ দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কওয়েন মুলিন গত মাসে ওমরের পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের বিষয়টি নিয়ে চলমান তদন্তের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। রক্ষণশীল ধারার পডকাস্ট উপস্থাপক বেনি জনসনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেছিলেন, এ বিষয়ে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। মুলিন আরও বলেন, ওমর বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অধিকার ছিল না বলে প্রমাণ করা গেলে তাঁদের বহিষ্কার করা হতে পারে।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের তিন সপ্তাহের কিছু বেশি সময় আগে ওমরের বাড়িতে এ অভিযান চালানো হলো। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায় ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি। ৪৪ বছর বয়সী ওমর মিনেসোটার একটি ডেমোক্র্যাট-সমর্থিত আসনের প্রতিনিধি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৫০ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হন। এবারও তিনি প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হওয়ার জন্য লড়ছেন। জিতলে এটি হবে তাঁর পঞ্চম মেয়াদ।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস এবং দলের অন্য নেতারা এ অভিযানের নিন্দা জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, ঘটনাটি গভীর উদ্বেগজনক এবং এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারকে ব্যবহার করছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। জেফ্রিসের সঙ্গে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ক্যাথরিন ক্লার্ক ও পিট আগুইলারও ওমরকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ করেন। তাঁদের ভাষ্য, ট্রাম্পের অভিবাসীদের বহিষ্কারের অভিযান এখন জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন কংগ্রেস সদস্য ও তাঁর পরিবারের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছেছে। তাঁরা এ ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজও অভিযানের সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করতে ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন।
অন্যদিকে, রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যক এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন। তাঁদের একজন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ন্যান্সি মেস বলেন, জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওমরের নাগরিকত্ব বাতিল করে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা উচিত। তবে তদন্তের অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি।
মার্কিন বিচার বিভাগের নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করা বা কোনো প্রার্থী কিংবা দলকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তদন্তের সময় নির্ধারণ করা যাবে না। ঐতিহাসিকভাবে নির্বাচনের প্রায় ৬০ দিনের মধ্যে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে দৃশ্যমান তদন্তমূলক পদক্ষেপ এড়িয়ে চলার রীতি রয়েছে।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক সরকারি দুর্নীতির মামলার কৌঁসুলি র্যান্ডাল ইলিয়াসন বলেন, নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে এ ধরনের অভিযান বিচার বিভাগের অতীত চর্চা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। তবে এ নীতি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তদন্ত সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তির ভাষ্য, তল্লাশির আগে বিচার বিভাগের পাবলিক ইন্টিগ্রিটি বিভাগ এবং ভারপ্রাপ্ত উপবিচারমন্ত্রী ট্রেন্ট ম্যাককটারের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছিল। কংগ্রেস সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবে পরামর্শ দিয়ে আসা বিভাগটির কর্মীসংখ্যা ট্রাম্প প্রশাসন কমিয়ে প্রায় দুই আইনজীবীতে নামিয়ে এনেছে এবং এর ক্ষমতার বড় অংশ সীমিত করেছে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত কয়েকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও অভিযোগ দায়ের করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন এফবিআইয়ের সাবেক পরিচালক জেমস কোমি, নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস এবং ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন। এ ছাড়া সামরিক বাহিনীকে অবৈধ আদেশ না মানার আহ্বান জানানো ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা, সিনেটর অ্যাডাম শিফ এবং ফেডারেল রিজার্ভের কর্মকর্তা জেরোম পাওয়েল ও লিসা কুকের বিরুদ্ধেও তদন্ত হয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, জেমসের বিরুদ্ধে মামলা এবং কোমির বিরুদ্ধে করা দুটি মামলার একটির অভিযোগ ফেডারেল বিচারক খারিজ করেছেন। অন্যদিকে, বোল্টন দোষ স্বীকার করেছেন এবং চলতি মাসে তাঁর সাজা ঘোষণার কথা রয়েছে। কয়েকটি তদন্তে গ্র্যান্ড জুরি ও ফেডারেল বিচারকেরা অগ্রগতিতে বাধা দিয়েছেন।
ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ওমর এবং সোমালি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। ওমর ট্রাম্পের তাঁর প্রতি মনোযোগকে ‘অস্বাস্থ্যকর ও অদ্ভুত আসক্তি’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ট্রাম্পের ঘৃণামূলক রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন।
গত মাসে মিনেসোটার এক ব্যক্তি ওমরের গায়ে ভিনেগার ছিটিয়ে দেন। পরে এক ফেডারেল কর্মকর্তাকে আক্রমণের অভিযোগ স্বীকার করায় অ্যান্থনি জেমস কাজমিয়ারচাক নামের ওই ব্যক্তিকে ১৪ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি স্বীকার করেছেন, ওমরের প্রগতিশীল রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে একমত না হওয়ায় তাঁকে আক্রমণ করেছিলেন। তবে ওই হামলার সঙ্গে ওমরের বাড়িতে চালানো অভিযানের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তথ্য জানানো হয়নি। তথ্যসূত্র: রয়টার্স