
পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরণ ঘিরে বিতর্ক-সমালোচনার শেষ নেই। বইয়ে কতটা মানসম্মত গল্প-কবিতা, প্রবন্ধ রয়েছে; তার চেয়েও বেশি নজর থাকে কাগজ ও ছাপার মানের দিকে।প্রতি বছরই শিক্ষার্থীদের হাতে নিম্নমানের কাগজের বই দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিভাবক, শিক্ষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলের তীর্যক সমালোচনার মুখে পড়তে হয় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি)। সেই সমালোচনা এড়াতে এবার পাঠ্যবইয়ের কাগজে জলছাপ দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। তাতে বইয়ের প্রতিটি পাতায় থাকবে এনসিটিবির লোগো সংবলিত জলছাপ। কাগজ হবে অফ হোয়াইট।২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার কার্যক্রম এপ্রিল-মে মাস থেকে শুরু করতে চায় এনসিটিবি। পাঠ্যবই ছাপা ঘিরে সংকট ও সমালোচনা এড়াতে দুই ডজন শর্তারোপ করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। তার মধ্যে জলছাপযুক্ত কাগজে বই ছাপা অন্যতম। এ নিয়ে ছাপাখানা ও কাগজের মিলমালিকসহ অংশীজনদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করেছেন পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কর্মকর্তারা।
জলছাপযুক্ত কাগজে বই ছাপতে আগ্রহী অধিকাংশ ছাপাখানার মালিক। তবে কাগজের মিলমালিক ও কিছু ছাপাখানার মালিক এ উদ্যোগের বিরোধিতা শুরু করেছেন। পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সভায় বসেই বিষয়টি নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। তবে যে কোনো উপায়ে জলছাপযুক্ত কাগজে পাঠ্যবই ছাপানোর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে চায় এনসিটিবি। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে কাগজ আমদানি করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকার শতচেষ্টা করেও পাঠ্যবইয়ে নিম্নমানের কাগজের ব্যবহার ঠেকাতে পারছে না। পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে এ নিয়ে মুখে মুখে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। বেশি লাভের আশায় কিছু ছাপাখানা কৌশলে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপিয়ে তা শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করছেন কাগজের মিলমালিকরা।সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিম্নমানের কাগজে ছাপা বইয়ের স্থায়িত্ব কম। দুই মাস না যেতেই বইয়ের পাতা ছিঁড়ে যাচ্ছে। অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে ছাপা অক্ষরও। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। পাশাপাশি অনুজ্জ্বল কাগজের অস্পষ্টভাবে ছাপা বই ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যগত অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
চিকিৎসকদের তথ্যমতে, নিম্নমানের কাগজে বই ছাপা হলে শিশুদের চোখে সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার বইয়ের পাতা উল্টাতে অনেকেই আঙুলে মুখের লালা (থুতু) ব্যবহার করে। ফলে শিশুদের পেটে চলে যায় নিম্নমানের কাগজে ব্যবহার করা বিষাক্ত কেমিক্যালস, যা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।২০১০ সাল থেকে সরকার বছরের শুরুতে সারাদেশের সব শিক্ষার্থীকে বিনা মূল্যে পাঠ্যবই দিয়ে আসছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রতি বছর এ কাজ বাস্তবায়ন করে। তবে শুরু থেকেই পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের খপ্পরে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপা হচ্ছে।পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, সরকারকে অনেকটা জিম্মি করে ছাপাখানা ও মিলমালিকরা এ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এনসিটিবি ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভাঙার চেষ্টা চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বইয়ে ব্যবহার করা কাগজে এনসিটিবির লোগোর জলছাপ রাখার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।