খুরশীদ আলমকে অপসারণে ইসলামী ব্যাংকে স্বস্তি, কমেছে আমানত তোলার চাপঢাকায় দুপুরের মধ্যে বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে২ সন্তানের পর মাতৃত্বকালীন ছুটি সীমিতের বিধান চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদনসৃজনশীল অর্থনীতির পথে বাংলাদেশহরমুজে জাহাজ চলাচল শুরুর দাবি ট্রাম্পের, টোল নেবে ইরান
No icon

সৃজনশীল অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ

প্রথাগত শিল্প ও উৎপাদননির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর গণ্ডি পেরিয়ে জ্ঞান, সংস্কৃতি, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতাকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল অর্থনীতি কে একটি স্বতন্ত্র উন্নয়ন দর্শন হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। পূর্বাচলে ১৬০ একর জমির ওপর আন্তর্জাতিকমানের ক্রিয়েটিভ হাব প্রতিষ্ঠা, দেশজুড়ে আঞ্চলিক সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ে তুলতে ১০ বছরের বিনিয়োগ কর্মপরিকল্পনা, ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান, প্রতিটি গ্রামে একটি করে সৃজনশীল পণ্য চিহ্নিতকরণ এবং ৬৪ জেলায় ৬৪টি স্পোর্টস ভিলেজ প্রতিষ্ঠার মতো উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি স্থান পেয়েছে বাজেটে। সরকারের প্রত্যাশা, সংস্কৃতি, পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজাইন, মিডিয়া, চলচ্চিত্র, গেমিং ও হস্তশিল্পভিত্তিক শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের পাশাপাশি বাংলাদেশকে মেধাভিত্তিক অর্থনীতির নতুন যুগে প্রবেশ করাবে।১০ বছরের মহাপরিকল্পনা ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক : শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে এই সৃজনশীলতার সুফল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিতে সরকার একটি দশ বছরের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর আওতায় দেশজুড়ে গড়ে তোলা হবে একাধিক আঞ্চলিক হাব যা স্থানীয় মেধা অন্বেষণ ও তা বিকাশে কাজ করবে। পাশাপাশি, দেশের টেক্সটাইল, হস্তশিল্প, আইটি ও নির্মাণ খাতকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে গঠন করা হচ্ছে একটি শক্তিশালী ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনারস । এই পুলের মাধ্যমে দেশীয় পণ্যে আন্তর্জাতিক মানের ডিজাইনের ছোঁয়া দেওয়া সম্ভব হবে।

৮০০ কোটির বিনিয়োগে ৫ লাখ কর্মসংস্থান

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে সরকারের সুনির্দিষ্ট কর্মসংস্থানমুখী কৌশল। সৃজনশীল অর্থনীতির এই খাতগুলোতে সরকার প্রাথমিক পর্যায় ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ৫ লাখ দক্ষ ও আধা-দক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে, যা দেশের বেকারত্ব হ্রাসে বিশাল ভূমিকা রাখবে।

১টি গ্রাম ১ ক্রিয়েটিভ পণ্য এবং স্পোর্টস ভিলেজ একটি গ্রাম, একটি পণ্য উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সৃজনশীল অর্থনীতিভিত্তিক পণ্য অর্থাৎ মৃৎশিল্প, বুননশিল্প, শীতলপাটি, কাঠের খেলনা, হাতে তৈরি গয়না, টেরাকোটা ইত্যাদি পণ্য চিহ্নিত করার কাজও করবে বিসিক। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দেশীয় ডিজাইনারদের সমন্বয়ে করা হবে একটি জাতীয় পুল, যে ব্যাপারে সরকারকে প্রস্তাব দেবে জয়িতা ফাউন্ডেশন। ঢাকায় বহুতল ভবন ও ছয় বিভাগীয় শহরে জয়িতা ফাউন্ডেশনের জায়গা রয়েছে, যেসব জায়গায় হবে সৃজনশীল কেন্দ্র। পর্যটন খাতের সামগ্রিক সম্ভাবনা, বৈচিত্র্য ও ধারণা নিয়ে একটি পর্যটন মহাপরিকল্পনা হাতে নেবে সরকার। ট্যুরিজম বোর্ড এটা চূড়ান্ত করবে। পর্যটন খাতের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কক্সবাজারে করা হবে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যা বাস্তবায়ন করবে পর্যটন করপোরেশন।

লোকসংস্কৃতি ও হস্তশিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার প্রসার

লোকসংস্কৃতি ও হস্তশিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার প্রসারে বিশেষ উদ্যোগ নেবে সরকার। লোকসংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে লোকসংগীত, লোকনৃত্য, পালাগান, জারিগান ইত্যাদি। এ ছাড়া আছে হস্তশিল্প। হস্তশিল্পের মধ্যে রয়েছে শীতলপাটি, মাটির কাজ, বাঁশ ও বেতশিল্প। আর ঐতিহ্যবাহী উৎসবের মধ্যে রয়েছে বাংলা নববর্ষ, গ্রামীণ মেলা ইত্যাদি। আরও কয়েকটি খাতও চিহ্নিত করা হয়। বলা হয়েছে, শিল্পকলা ও পারফর্মিং আর্টসের মধ্যে রয়েছে থিয়েটার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সংগীত, নাটক, নৃত্য, চিত্রকলা ও ভাস্কর্য। মিডিয়া ও বিনোদনশিল্পের মধ্যে রয়েছে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও রেডিও সম্প্রচার, কনটেন্ট তৈরি, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ইত্যাদি। প্রকাশনা ও সাহিত্যের মধ্যে বই, পত্রিকা, জার্নাল, অনলাইন ব্লগ ও ডিজিটাল প্রকাশনা, অনুবাদ ও সাহিত্যকর্ম ইত্যাদি। ডিজাইন ও ক্রিয়েটিভ সেবার মধ্যে রয়েছে গ্রাফিক ডিজাইন, ইন্টেরিয়র ডিজাইন। তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল ক্রিয়েটিভিটির মধ্যে রয়েছে সফটওয়্যার ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ডিজাইন ইত্যাদি।

৬৪টি জেলায় ৬৪টি স্পোর্টস ভিলেজ

তাছাড়া, তরুণদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশকে সৃজনশীল অর্থনীতির অংশ করতে দেশের ৬৪টি জেলায় ৬৪টি স্পোর্টস ভিলেজ প্রতিষ্ঠার যুগান্তকারী ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই স্পোর্টস ভিলেজগুলো জেলা পর্যায়ে ক্রীড়া চর্চা, ক্রীড়া সামগ্রী উৎপাদন এবং তরুণদের সুস্থ বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং বাংলাদেশকে একটি মেধাভিত্তিক ও স্বনির্ভর অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়ার এক সাহসী ব্লুপ্রিন্ট।অর্থ বিভাগের মতে, এ খাত এগিয়ে নিতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করতে চায়। সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ স্টার্টআপ (নতুন উদ্যোগ) তহবিলও গঠন করা যায়। তবে বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। সরকার থাকবে সহযোগিতাকারীর (ফ্যাসিলিটেটর) ভূমিকায়।

সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে এ খাতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে এখনও মেধাস্বত্ব সুরক্ষার দুর্বলতা, পাইরেসি, কপিরাইট লঙ্ঘন, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিকমানের স্টুডিও, অ্যানিমেশন ল্যাব, ডিজিটাল মনিটাইজেশন কাঠামো এবং কপিরাইট বাণিজ্য ব্যবস্থাও দুর্বল।বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ক্রিয়েটিভ ইকোনমি বা সৃজনশীল অর্থনীতি সংক্রান্ত ঘোষণাটি দেশের ইতিহাসে এক অনন্য ও সময়োপযোগী মাইলফলক। প্রথাগত অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে পর্যটনের সঙ্গে থিয়েটার, সংগীত, চলচ্চিত্র ও শিল্পকলাকে যুক্ত করার এই ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প দেশের প্রবৃদ্ধিতে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করবে। বিশেষ করে ঢাকার পূর্বাচলে ও ঢাকার বাইরে বিনোদনধর্মী সৃজনশীল হাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নাগরিক জীবনে স্বস্তি আনার পাশাপাশি দেশীয় সংস্কৃতিকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করবে। তাছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর খাত থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ এবং অবহেলিত ধর্মীয় পর্যটন সাইটগুলো পুনর্নিমাণের পরিকল্পনা অত্যন্ত দূরদর্শী। অর্থমন্ত্রী বলেন, কেবল বিদেশি পর্যটকের ওপর নির্ভর না করে অভ্যন্তরীণ বিপুল পর্যটকদের সঠিক পরিচর্যা ও অবকাঠামো সুবিধা দিতে পারলে তা অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। কোরিয়ান সংস্কৃতির বৈশ্বিক জনপ্রিয়তার উদাহরণ টেনে দেশীয় সংগীত ও শিল্পকে মনেটাইজ বা অর্থায়নের যে রূপরেখা তিনি দিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন হলে দেশের মেধা ও সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক বাজারে বড় সম্পদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।