এফডিসির ঘটনায় ডিপজল-মিশা সওদাগরের দুঃখ প্রকাশপ্রধানমন্ত্রী আজ থাইল্যান্ড যাচ্ছেনগরমের তীব্রতা কমাতে কী কাজ করেছেন, জানালেন হিট অফিসারবিনা ভোটে নির্বাচিত ৩৩ প্রার্থীসব ধরনের যাত্রীবাহী ট্রেনে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে
No icon

দেড় বছরে ভোগ্যপণ্যের দাম তিন গুণ

দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে চলছে মূল্যবৃদ্ধির লাগামহীন ঘোড়দৌড়। দেড় বছরের ব্যবধানে কোনো কোনো পণ্যের দাম বেড়েছে দুই থেকে তিন গুণ। হু হু করে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলার সংকট, দেশীয় টাকার অবমূল্যায়নসহ কমপক্ষে ১৫টি কারণ চিহ্নিত করেছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা। ভবিষ্যতে এ পরিস্থিত আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহাবুবুল আলম বলেন, দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বে খাদ্য সরবরাহ চেইন বিঘ্ন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট ও এলসি সমস্যা অন্যতম। বিশ্ব খাদ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম কমার সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে যে অবস্থা দেখছি তাতে অদূর ভবিষ্যতে তা স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণ নিয়ে খাতুনগঞ্জের অন্যতম আমদানিকারক সোলায়মান বাদশা বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর অনেক দেশ থেকে সরাসরি পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে না। তৃতীয় কোনো দেশ হয়েই আমদানি করতে হচ্ছে। এতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে অনেকাংশ। এ ছাড়া ডলার সংকট, বাংলাদেশি টাকার অবমূল্যায়নসহ নানা কারণে আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়ছে। বিশ্ববাণিজ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ভোগ্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বমুখিতা থামবে না।

জানা যায়, দেড় বছর ধরেই ঊর্ধ্বমুখী দেশের অন্যতম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চাক্তাই খাতুনগঞ্জ। এ সময়ের মধ্যে চাল, ডাল, ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম পাইকারি বাজারে বেড়েছে কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত। কোনো কোনো পণ্যের দাম আবার হয়েছে দুই থেকে তিন গুণ। ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার জন্য কমপক্ষে ১৫টি কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ট্যাক্স বৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবারহ চেইন বিঘ্ন, দেশে দেশে অর্থনৈতিক মন্দা, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, জাহাজভাড়া বৃদ্ধি, আগের মতো সব দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে না পারা, দেশে ডলার সংকট, আমদানিকারকদের প্রত্যাশিত এলসি খুলত না পারা, এলসি নিয়ে সরকারের কড়াকড়ি, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া, কতিপয় আমদানিকারকের সিন্ডিকেট কারসাজি, বিভিন্ন রপ্তানিকারক দেশ রপ্তানি-নীতি পরিবর্তন করে পণ্য মজুদ নীতি অনুসরণ করা, পণ্য মজুদে আন্তর্জাতিক কারসাজি সক্রিয় হওয়া ইত্যাদি।

অপরদিকে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা মসলাজাতীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী করেছেন বিদেশিদের কারসাজিকে। তাদের মতে, বাংলাদেশে আমদানি করা সিংহভাগ মসলা আসে ভারত, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম, চীন, গুয়েতেমালা, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার থেকে। তবে এ পণ্য ওই দেশগুলো থেকে সরাসরি বাংলাদেশ আছে না। সংযুক্ত আবর আমিরাত, সিঙ্গাপুর কিংবা তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে পণ্যগুলো বাংলাদেশে আমদানি হয়। তৃতীয় দেশ হয়ে আমদানির ফলে বেড়ে যাচ্ছে মসলার দাম। দেশের অন্যতম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে সরেজমিন পরিদর্শন করে মিলেছে ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ভয়ংকর চিত্র। ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের মে পর্যন্ত ১৯ মাসের ব্যবধানে যে কোনো পণ্যের দাম বেড়ে হয়েছে দুই থেকে তিন গুণেরও বেশি, যার মধ্যে চিনি, পিঁয়াজ, মরিচ, মসলাজাতীয় পণ্যসহ কমপক্ষে ১৫ ধরনের ভোগ্যপণ্য রয়েছে। ২০২১ সালের অক্টোবরে খাতুনগঞ্জে চিনি ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ১২১ টাকা কেজি। ওই সময় ২৫ টাকায় পিঁয়াজ বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা। ২০২১ সালে মরিচ রকমভেদে ৯০ থেকে ৯৫ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৩৭০ থেকে ৪৬০ টাকা। ২৫৫ টাকার জিরা বিক্রি হচ্ছে ৭৬০ টাকা। ৩৩৫ টাকার গোলমরিচ বিক্রি হচ্ছে ৬৪০ টাকা। ৭০ টাকার ধনিয়া বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা। ২৫ টাকার মটর বিক্রি হচ্ছে ৫৪ টাকা। ১৫০ টাকার মিষ্টি জিরা ৩০৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

একই সময়ের ব্যবধানে প্রতি কেজি চাল রকমভেদে ২৪ থেকে ৫০ টাকা বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৯০ টাকা। এ ছাড়া কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে কিছু ভোগ্যপণ্যের দাম, যার মধ্যে ২০২১ সালের ১০০ টাকার ভোজ্য তেল বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকা। ১৫৫ টাকার আদা বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকা। ৯০ টাকার রসুন বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা। ১ হাজার টাকার লবঙ্গ ১ হাজার ৪৫০ টাকা। ৫০ টাকার চনাবুট ৭০ টাকা। ৯০ টাকার হলুদ বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকা। ৭০ টাকার মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৮৮ টাকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ডলারের প্রয়োজনীয় মজুদ রয়েছে। চাইলেই এলসি করা যাবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি একেবারের ভিন্ন। শতভাগ মার্জিন দিয়েও কেউ এলসি করতে পারছেন না। দেড়-দুই মাস ঘুরেও এলসি খুলতে না পারার কারণে ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে দেশে আমদানিপণ্যের দাম হু হু করে বেড়েছে। এ ছাড়া ডলার সংকট, ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশিত এলসি খুলতে না পারা এবং টাকার মান কমে যাওয়ায় পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে আমদানিকারকদের কিছুই করার ছিল না। ভবিষ্যতে এ সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।