দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই ছড়িয়ে পড়েছে হামের সংক্রমণ। এই রোগ এখন দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। এ নিয়ে আতঙ্কে রয়েছে সাধারণ মানুষ। এরই মধ্যে মারা গেছে ২৪০ জন, যাদের সবাই শিশু। বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতীয় পর্যায়ে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। টিকার ঘাটতি ও পুষ্টিহীনতাকে দায়ী করছে এই সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার ডব্লিউএইচওর প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এর আগে গত ১৮ মার্চ বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জেনেভা কার্যালয়কে অবহিত করে ঢাকা কার্যালয়। তারপর এমন উদ্বেগজনক তথ্য জানালো তারা।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এক সময় হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল বাংলাদেশ। হামপ্রতিরোধী টিকাদান ধারাবাহিকভাবে বেড়ে উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং রোগীর সংখ্যা কমে এসেছিল দ্রুত গতিতে। ২০০০ সালে হামপ্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজের কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয় ১১৮ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজ দেশব্যাপী চালুর পর ২০১২ সালে কভারেজ ছিল ১২২ শতাংশ। ২০২৪ সালে ছিল ১২১ শতাংশ। এই সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম রোগীর হার দ্রুত কমে আসে। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালে এমআর টিকার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানের ফাঁক এবং দীর্ঘদিন সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি না থাকার কারণে সেই অগ্রগতি এখন হুমকির মুখে। এ ছাড়া পুষ্টিহীনতার ফলে সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বেড়ে গিয়ে বর্তমান প্রাদুর্ভাব তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের পেছনে বড় কারণ টিকাদানে ঘাটতি। অনেক শিশু একেবারেই টিকা পায়নি, আবার কেউ পেয়েছে মাত্র এক ডোজ। এমনকি কিছু শিশু টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এক থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যেও বড় ধরনের রোগ প্রতিরোধ ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের জাতীয় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি বা আইএইচআর ফোকাল পয়েন্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানায়, দেশে হাম রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই বৃদ্ধি হয়েছে দেশের ভেতরে চলমান সংক্রমণের কারণে। জানুয়ারি থেকেই বাংলাদেশে হাম রোগীর সংখ্যা স্পষ্টভাবে বাড়তে দেখা যাচ্ছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন মূল্যায়নের পর সংস্থাটির সাবেক পরামর্শক ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, জানুয়ারি থেকেই দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে এবং তা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় হামকে জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করা এবং দ্রুত টিকাদান জোরদার করা প্রয়োজন।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা প্রায় দুই হাজার ৮৯৭। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৬৬ জন, যার মধ্যে নিশ্চিত মৃত্যু ৩০টি। মৃত্যু হার ১ দশমিক ১ শতাংশ। এ সময় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২ হাজার ৩১৮ জন রোগী, আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে প্রায় ৯ হাজার ৭৭২ জন।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য মতে, গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে চিকিৎসা নিয়েছে এক হাজার ২১৫ জন। পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৭২ জনের। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৬০ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে ২৯ হাজার ৫৪৯ জন সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য পেয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৯৮ জনের। পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত করা গেছে চার হাজার ২৩১ জনের। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪২ জনের। বস্তি এলাকায় রোগী বেশি সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে ঢাকা বিভাগে, এরপর রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায় রোগীর হার বেশি। ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এই প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। সন্দেহভাজন মৃত্যুর বেশির ভাগই টিকা না পাওয়া ছোট শিশুদের মধ্যে। আক্রান্তদের ৮৩ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। আর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। এ ছাড়া দুই বছরের নিচে শিশুদের হার ৬৬ শতাংশ। ৯ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৩ শতাংশ।
নবজাতকদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি জনস্বাস্থ্যবিদদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। সাধারণত বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজ (এমআর) দেওয়া হয় ৯ মাস পূর্ণ হলে। কিন্তু এর আগেই শিশুরা আক্রান্ত হওয়ার পেছনে কারণ কী জানতে চাইলে শিশু হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. শাকিল আহম্মদ বলেন, প্রাকৃতিকভাবে নবজাতক জন্মের সময় তার মায়ের শরীর থেকে প্লাসেন্টার মাধ্যমে হামের বিরুদ্ধে কিছু অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। এই ক্ষমতা শিশুকে জীবনের প্রথম কয়েক মাস রক্ষা করে। তবে সমস্যা, যদি মা নিজে হামের টিকা না নিয়ে থাকেন বা ছোটবেলায় হামে আক্রান্ত না হন, তবে তার শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি থাকে না। ফলে তার শিশু জন্মগতভাবেই এই সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় এবং ৯ মাস হওয়ার আগেই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। ভাইরাসের প্রকোপ যখন তীব্র হয়, তখন শিশুদের শরীরে থাকা মায়ের দেওয়া সামান্য অ্যান্টিবডি সেই ভাইরাসের লোড সামলাতে পারে না। ফলে টিকার বয়স হওয়ার আগেই শিশুটি আক্রান্ত হয়ে পড়ে। আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ অপুষ্টিতে ভুগছে। যেসব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল বা যাদের শরীরে ভিটামিন এ -র ঘাটতি রয়েছে, তারা অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়। সামান্য সংস্পর্শেই ভাইরাসটি তাদের শরীরে বাসা বাঁধতে পারে।