তীব্র গ্যাস সংকটের শঙ্কাস্বাস্থ্য সংস্কারের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করবে সরকারবিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রীজামায়াতের ইফতারে প্রধানমন্ত্রীইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত: ইরনা
No icon

তীব্র গ্যাস সংকটের শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান সংঘাত তীব্র হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও রান্নার গ্যাস (এলপিজি) আমদানি ব্যাহত হলে দেশে গ্যাস সংকট আরও গভীর হতে পারে এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনটি হলে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে।গত জানুয়ারি থেকে এলপিজির বাজারে চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছে। ফেব্রুয়ারিতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে দ্বিগুণ মূল্যে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছিল ক্রেতাদের। সেই সংকট খানিকটা কমলেও এখনও প্রতি সিলিন্ডারে ৪০০-৫০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে গ্রাহককে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এলপিজি খাতকে আবার অস্থিতিশীল করতে পারে বলে শঙ্কা খাতসংশ্লিষ্টদের। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের মজুতেও টান পড়তে পারে। যদিও সরকার বলছে, জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সমুদ্রপথেও অনেক জাহাজ রয়েছে।জ্বালানির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল রোববার সচিবালয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে অবহিত করেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী যে কোনো মূল্যে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। বৈঠকের পর হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

এলএনজি সরবরাহ নিয়ে সর্বোচ্চ উদ্বেগ

বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট আমদানি করা এলএনজি। অর্থাৎ মোট সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশের বেশি আমদানিনির্ভর। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করে ১১৫টি কার্গোর মাধ্যমে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রায় ৪০ লাখ টন আসে কাতার থেকে। বাকি অংশের বড় উৎস ওমান, সেটিও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি। পাশাপাশি স্পট বাজার থেকেও এলএনজি কেনা হয়।বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনালে কার্গো থেকে এলএনজি তাপমাত্রা স্বাভাবিক করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। মার্চ মাসে ১১টি কার্গো আসার কথা রয়েছে এর মধ্যে ৯টি এরই মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এলাকা এড়িয়ে নিরাপদে অতিক্রম করেছে। ৩ মার্চ একটি কার্গো এবং এর দুদিন পর কাতার থেকে আরেকটি কার্গো পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সমুদ্রে এখনও ২-৩টি কার্গো রয়েছে।তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো একটি কার্গো সরবরাহে ব্যাহত হলে দেশে গ্যাসের সংকট তীব্র আকার নিতে পারে। কারণ পাইপলাইনের গ্যাসে ঢাকাসহ দেশের বড় অংশে ইতোমধ্যে স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না।এ ছাড়া সংকট দীর্ঘায়িত হলে এলএনজির আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে, যা অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়াবে। গত বছর এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

এলপিজি বাজারে নৈরাজ্যের শঙ্কা

দেশে বছরে প্রায় ১৮ লাখ টন এলপিজি আমদানি করে ৯টির মতো বেসরকারি কোম্পানি। এর মধ্যে দুটি কোম্পানির নির্বাহী কর্মকর্তা সমকালকে জানিয়েছেন, আমদানি কমলেই বাজারে সংকট তৈরি হয়। গত নভেম্বরে এলপিজি আমদানি ৪৪ শতাংশ কমে যায়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে তা বাড়েনি। ফলে জানুয়ারিতে তীব্র সংকট দেখা দেয়। পরে সরকার আমদানি বাড়ানোর অনুমতি দিলে ফেব্রুয়ারিতে এলপিজি আমদানি বেড়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে ৯১ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি। তারা বলেন, ইরানে হামলার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। দাম আবার বাড়তে পারে।শুল্ক কমায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজির দাম ১৫ টাকা কমিয়ে এক হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করে। বাস্তবে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৮৫০ টাকায়। সংকট তীব্র হরে এই দাম গ্রাহকের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. এম তামিম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানির দেশের জন্য অশনিসংকেত। বিশেষ করে তেল, এলএনজি ও এলপিজির দাম হু-হু করে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। সরকারের অবস্থান

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সরকার বলছে, দেশে ৩০ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করে অবশিষ্ট এলএনজি কার্গো পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে। মার্চে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে না পড়ে। অর্থাৎ ডিজেলের দাম আগের মতোই ১০০ টাকা লিটার, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থাকবে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে এক দিনে ক্রুড অয়েলের দাম ১০ শতাংশ বেড়েছে।গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের যে মজুত আছে, সেটা নিয়ে তেমন কোনো অসুবিধা হবে না।জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, দেশে বর্তমানে ৩০ দিনের জ্বালানি মজুদ রয়েছে। ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই সর্বোচ্চ পরিমাণ এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। ফলে তাৎক্ষণিক কোনো সংকটের শঙ্কা নেই। তিনি আরও বলেন, চলমান সংঘাত সত্ত্বেও কাতার থেকে বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করে অবশিষ্ট এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছাবে বলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ আশা করছে।