মিশরের ভূমিকম্পে ইসরায়েলে কম্পন, ক্ষতির খবর নেইবৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে আগামী ৩ থেকে ৪ দিনবন্যা নিয়ে দুঃসংবাদএনআইডি সংশোধন সহজ করতে ইসির কমিটিএমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি চালু
No icon

তীব্র দাবদাহ ও দাবানলে বিপর্যস্ত ইউরোপে যেভাবে বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা

জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে বদলে যাচ্ছে ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী আবহাওয়া। একসময় যা ছিল ব্যতিক্রমী উচ্চ তাপমাত্রা, তা-ই এখন ইউরোপীয় গ্রীষ্মের সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া তাপমাত্রা, প্রখর খরা এবং সংহারী দাবানল কেবল ইউরোপের পরিবেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং বদলে দিচ্ছে সেখানকার অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের ‘কপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস’ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও স্পেনের বেশ কিছু অঞ্চলে মে ও জুন মাসের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি দেখা গেছে।

আগেভাগেই দাবানলের গর্জন
ভূমধ্যসাগরীয় দেশসমূহ—যেমন স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস, ইতালি ও ফ্রান্সে দাবানল নতুন কিছু নয়। তবে এখন আর নির্দিষ্ট মরসুমে তা সীমাবদ্ধ নেই; দাবানল শুরু হচ্ছে বছরের অনেক আগেই এবং ছড়াচ্ছে এমন সব অঞ্চলে, যা আগে ঝুঁকিমুক্ত ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্যমতে, গত এক বছরে অন্তত ১০ লাখ হেক্টর বনভূমি ও ভূমিরূপ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যা ঐতিহাসিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। কিছু কিছু শক্তিশালী দাবানল নিজস্ব আবহাওয়া বলয় তৈরি করে ‘পাইরোকিউমুলোনিম্বাস’ মেঘ তৈরি করছে, যার ফলে ঝড়ো বাতাস ও বজ্রপাতে মাইলের পর মাইল দূরেও নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে।

পানি ও কৃষিতে মহাবিপর্যয়
তীব্র তাপদাহে ইউরোপের বড় বড় নদীগুলোর পানি শুকিয়ে আশঙ্কাজনক স্তরে নেমে এসেছে। রাইন, পো ও দানিয়ুবের মতো প্রধান নদীগুলোতে পানিসঙ্কট তৈরি হওয়ায় পণ্য পরিবহন, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প কারখানার কুলিং ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি খাত। ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এবং ইউরোপীয় কমিশনের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপে বার্ষিক কৃষি ক্ষতির পরিমাণ ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা সরাসরি খাদ্য সুরক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতের ওপর চাপ
ইউরোপে সবচেয়ে নিরবঘাতক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে এই দাবদাহ। শিশু, বয়স্ক ও ক্রনিক রোগে আক্রান্তদের নিয়ে হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর ভিড়। কংক্রিট ও পিচ দিয়ে ঘেরা শহরগুলোতে ‘আর্বান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব তৈরি হওয়ায় রাতেও উত্তাপ কমছে না।

তাপ থেকে বাঁচতে মানুষ ব্যাপকভাবে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারে ঝুঁকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আশ্চর্যজনকভাবে, যখন বিদ্যুতের চাহিদা তুঙ্গে, ঠিক তখনই নদীগুলোর পানি অতিরিক্ত গরম থাকায় থার্মাল ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

বার্ষিক ক্ষতির পাহাড়
১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চরম আবহাওয়ার কারণে ইউরোপের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৭৩৮ বিলিয়ন ইউরো। কেবল শেষ তিন বছরেই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬২ বিলিয়ন ইউরো। এ ছাড়া অধিকাংশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের আর্থিক ক্ষতির কোনো বীমা কভারেজ থাকে না, যা সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারগুলোর ওপর বড় আর্থিক চাপ ফেলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র জলবায়ু পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টাই যথেষ্ট নয়। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে না কমালে আগামী দিনগুলোতে এ ধরনের অতি-উত্তপ্ত গ্রীষ্মই হয়ে উঠবে নতুন বাস্তবতা।