অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফস্তরের নিচে লুকিয়ে থাকা ভূখণ্ড নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করেছেন। এতে পাহাড়, গিরিখাত, উপত্যকা ও সমতলের একটি বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি উঠে এসেছে। এই প্রথম মহাদেশটির হাজারো পাহাড় ও ছোট ছোট ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।সায়েন্স সাময়িকীতে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। রয়টার্স জানায়, গবেষকরা মহাদেশটির মানচিত্র তৈরির জন্য অত্যাধুনিক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ এবং আইস-ফ্লো পার্টাব্রেশন অ্যানালাইসিস পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এই পদ্ধতিটি বরফপৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বরফের নিচে থাকা ভূপ্রকৃতি ও অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেয়। এর মাধ্যমে অজানা তথ্য পাওয়া গেছে।এই গবেষণার অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী এবং এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ রবার্ট বিংহাম বলেন, অ্যান্টার্কটিকার তলদেশের সঠিক মানচিত্র থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, তলদেশের গঠন বরফ প্রবাহের ঘর্ষণকে নিয়ন্ত্রণ করে। বরফ কত দ্রুত সাগরের দিকে প্রবাহিত হয়ে গলে যাবে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে, তা বোঝার জন্য এই তথ্যগুলো গাণিতিক মডেলে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
গবেষকরা অভূতপূর্ব সূক্ষ্মতার সঙ্গে এই মানচিত্র তৈরি করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তারা ৩০ হাজারেরও বেশি নতুন পাহাড় শনাক্ত করেছেন, যেগুলোর উচ্চতা অন্তত ১৬৫ ফুট (৫০ মিটার)।অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশটি ইউরোপের তুলনায় ৪০ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ৫০ শতাংশ বড়। রবার্ট বিংহামের মতে, বিশ্বের সব মহাদেশে যেমন উঁচু পর্বতমালা থেকে শুরু করে বিশাল সমতল ভূমি থাকে, অ্যান্টার্কটিকার লুকানো ভূপ্রকৃতিতেও তেমন বৈচিত্র্য রয়েছে।পৃথিবীর সব বরফের বড় অংশই অ্যান্টার্কটিকায় রয়েছে এবং এখানে গ্রহের প্রায় ৭০ শতাংশ বিশুদ্ধ পানি জমা আছে। এর বরফস্তরের গড় পুরুত্ব প্রায় ২.১ কিলোমিটার এবং সর্বোচ্চ পুরুত্ব ৪.৮ কিলোমিটার।অ্যান্টার্কটিকা সব সময় বরফে ঢাকা ছিল না। ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে এখানে বরফ জমতে শুরু করার আগে থেকে এই ভূপ্রকৃতি গঠিত হয়েছিল। একসময় এই মহাদেশটি দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল পরে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে এটি আলাদা হয়ে যায়।গবেষকরা জানিয়েছেন, এতদিন অ্যান্টার্কটিকা তলদেশের চেয়ে মঙ্গলের পৃষ্ঠতলের মানচিত্র বেশি নির্ভুল ছিল। আগে সাধারণত বিমান বা স্নোমোবাইলের রাডার দিয়ে এই জরিপ চালানো হতো, যাতে ফাঁক থেকে যেত।
গবেষণার প্রধান লেখক হেলেন ওকেনডেন বলেন, নতুন এই পদ্ধতি আশাব্যঞ্জক। কারণ, এটি আমাদের বরফ প্রবাহের গণিত এবং স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণকে একসঙ্গে ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে। মহাদেশের সব অংশের ভূপ্রকৃতি কেমন হতে পারে, তার পূর্ণাঙ্গ ধারণা আমরা পেয়েছি।জলবায়ু বিজ্ঞানে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলার গতিকে একটি বড় অনিশ্চয়তা হিসেবে দেখা হয়। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই মানচিত্র সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারবে।গবেষকরা জানান, বরফের নিচে থাকা পাহাড়, চূড়া ও খাঁড়িগুলোর অবস্থান বোঝা জরুরি। মূলত এই ভূপ্রকৃতির ওপরই নির্ভর করে ওপরের হিমবাহ কত দ্রুত সরবে কিংবা উষ্ণ জলবায়ুর কারণে গলে যাবে।