পার্লামেন্টে মালয়েশিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন: মাহাথিরশ‌র্তের জেরে কমেছে সঞ্চয়পত্রের বিক্রিমুজিববর্ষে মুসলিমবিদ্বেষী মোদিকে বাংলাদেশের জনগণ দেখতে চায় নাএবার ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট করোনায় আক্রান্তবিশ্বের ৮০ শতাংশ ইলিশ আহরণ হচ্ছে বাংলাদেশে
No icon

যুবাদের বিশ্বজয়, বুড়াদের আক্কেল এবং মনস্তত্ত্ব বোঝার লড়াই

বাংলাদেশের যুবারা ক্রিকেটে বিশ্ব জয় করেছে। অনেকেই অতি উৎসাহী হয়ে নানা উপমা উৎপ্রেক্ষায় উদ্বেলিত হয়ে পড়েছেন। অথচ আমার নিজের মনে হয়েছে বাংলাদেশের যুবারা নিজেদের ক্রমেই চিনতে পারছেন। যাতে ব্যর্থ হয়েছেন অনেক বুড়োরা। এ বিজয় তারই ধারাবাহিকতা। একটি জাতীয় দৈনিক ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ শিরোনামের খবরটি শুরু করেছে এভাবে, ‘ভারত মানেই মনস্তাত্ত্বিক এক লড়াই’। কথাটা মিছে নয়। আমাদের বুড়োরা এই লড়াই লড়ে যাবার যোগ্যতা হারিয়েছেন অনেক আগেই। তাদের ব্যর্থতার ইতিহাস, সর্বজনবিদিত। ফলে স্টেডিয়ামে যুবাদেরই প্ল্যাকার্ড তুলে সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদ জানাতে হয়। বিপরীতে বুড়োরা প্রতিবাদ তো দূরের কথা কেউ কেউ উল্টো কথা বলেন। ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্তগুলিতে মৃত্যুর হার শূন্য। এমনকি যেখানে প্রায়শই সীমান্ত সংঘাত ঘটে। সেখানেও দু’দিন পরপর সাধারণ মানুষ, যুদ্ধের ভাষায় ‘সিভিলিয়ান’ হত্যার এমন খবর নজরে পড়ে না।

এ হত্যা কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নয়, এগুলো স্রেফ হত্যাকাণ্ড। ঠাণ্ডা মাথায় খুন। যেমন ফেলানি হত্যা। আমরা যতই ভালোবাসার কথা বলি, ‘কাউন্টারপার্ট’ ততই ঘৃণার কথা বলে। কথাটায় যারা আপত্তি করবেন তাদের বলি। বাংলাদেশের ছেলেরা জিতেও সৌজন্যতাবশত বিজিত দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাতে গিয়েছিল।

বিপরীতে তারা অভদ্রতার চূড়ান্ত করলো। বাংলাদেশিদের দিকে মারার জন্য তেড়ে এলো। একজনের হাত থেকে বাংলাদেশের পতাকা কেড়ে নিয়ে ফেলে দেয়া হলো। এমনটাই জানিয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। এটা কি বন্ধুত্বের লক্ষণ না ঘৃণার?

তারপরও যারা সুর তোলেন, ‘মেরেছো কলসির কানা তাই বলে কি প্রেম দিব না’ তাদের জন্য করুণা। সৃষ্টিকর্তা তাদের বোধবুদ্ধি শানিত করুক। তারা বৃদ্ধ থেকে যুবা হয়ে উঠুক, অন্তত মানসিকভাবে।

বাংলাদেশের যুবারা যে এগিয়ে যাবার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন তা ভ্যাটবিরোধী, কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ধামাকাই প্রমাণ করে। এ আন্দোলনগুলিতে মানসিকভাবে জড় এবং শারীরিকভাবে বৃদ্ধ মানুষেরা তাদের সাথ দেননি। বরং উল্টো ক্ষেত্র বিশেষে যুবাদের আন্দোলনের আগুনে পানি ঢেলেছেন। সঙ্গতই এমন জড় আর বৃদ্ধদের নিয়ে জাতি কি করবে, এমন প্রশ্ন ট্রল হিসাবে সামাজিকমাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছে।

বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেরা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের নামে মাঠ কাঁপিয়ে দিয়েছে। অথচ তার সফলতা ঘরে উঠেনি বৃদ্ধদের করণীয় নির্ধারণ অকারণ হবার কারণে। ফলে নির্যাতিতরা হয়েছে আরো নির্যাতিত। যন্ত্রদানব যাদের বলা হয়, অর্থাৎ ট্রাক-বাসসহ বড় যানগুলোর কিছুই হয়নি।

ঝড়টা গিয়েছে মোটরসাইকেল আর প্রাইভেট কারগুলোর উপর দিয়ে। অথচ রাজপথে এরাই আক্রান্ত বা শিকার। আর শিকারী হলো সেই যন্ত্রদানবগুলো। জড় আর বৃদ্ধ মানসিকতার জন্য ঝড়টা সইতে হয়েছে-হচ্ছে, মোটরসাইকেলসহ শিকার হওয়া ছোট যানগুলোকেই। বিপরীত চিত্রে যে ছোটযানগুলোর রাজপথে চলার কোনো নিয়ম নেই, নিষিদ্ধ; সেগুলো চলছে অবলীলায়।

দুই.

খ্যাত এবং আমার প্রিয় লেখকদের একজন মঈনুল আহসান সাবের গণমাধ্যমে তার মন্তব্যে একটি প্রশ্ন টেনে এনেছেন এবং তা আলোচনার দাবিও রেখেছেন।

যুবাদের বিশ্বকাপ জয়কে সামনে রেখে তিনি বললেন, ‘চ্যাম্পিয়ন হওয়া অবশ্যই এক বিশাল ব্যাপার। এর পাশাপাশি একটি ব্যাপার খেয়াল করি, বিশাল এক অংশের কাছে পাকিস্তানের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হেরে যাওয়ার মধ্যে লজ্জা নেই, ইন্ডিয়াকে হারানোর মধ্যে আছে পরম গৌরব। এর পেছনে কী কী কারণ, সেসব আমরা দেখি ও বোঝার চেষ্টা করি?’

এই বোঝার চেষ্টা দিয়েই এ লেখার শুরুটা করেছিলাম। কেনো মৌখিক বন্ধু আমাদের প্রাণের বন্ধু হতে পারছে না, সেটা বোঝারই চেষ্টা। গণমাধ্যমের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই বলা’র কারণ খোঁজার চেষ্টা। সব চেষ্টার ফল একটাই মেয়ে আর ছেলের মধ্যে যেমন ঠিক সমান ধরণের বন্ধুত্ব গড়ে উঠা প্রাকৃতিক কারণেই সম্ভব নয়।

তেমনি দূর্বল আর সবলের সমবন্ধুত্ব মূলত কল্পনা প্রসূত। না ভুল বুঝবেন না, আমি নারী বিদ্বেষী নই। দুই ছেলেবন্ধুর যে স্বাভাবিক আচরণ, সেই আচরণের প্রায়োগিকতা মেয়েবন্ধুর কাছে অনেকটাই অচল এবং তা সঙ্গত কারণেই। এখানে কোনো বিদ্বেষ বা অন্যকিছু নেই।

যাক গে, বোঝার চেষ্টা বা মনস্তত্বের ব্যাপারে আসি। কেউ ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ককে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বলেছেন। এটা নিয়ে গণমাধ্যমে অনেক ট্রল হয়েছে-রয়েছে। আমি সেই ট্রলের বিরোধীতা করে বলি, এমন সম্পর্ক তবুও ভালো। যার একটা বৈধতা রয়েছে। তবে সম্পর্কটা যদি বৈধতার বাইরে পৌঁছায়। যেখানে শুধু থাকে একপক্ষীয় চাহিদা মেটানোর ব্যাপার। অন্যপক্ষের প্রাপ্তি হয়ে যায় গৌণ। তখন পেটে-ভাতে বেঁচে থাকা কিংবা টিকে থাকার মধ্যেই সে প্রাপ্তি ব্যাপ্ত থাকে।

এই যে, চারিদিকে এত ব্যবধান এটা সমবন্ধুত্বের কোনো লক্ষণ নয়। আমাদের দেশে অবৈধভাবে চাকরি করছে ভারতীয়রা, গণমাধ্যম এমনটাই জানিয়েছে।

উল্টো দিকে ওপারের বাংলাভাষীদের বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে পুশইনের চেষ্টা চলছে। সীমান্তে ক্রমাগত মানুষ হত্যা চলছে, বলতে গেলেই তাদের আখ্যা দেয়া হচ্ছে গরুচোর বা মাদক ব্যবসায়ী হিসাবে।

আমাদের পেঁয়াজের বাজার অশান্ত, মানুষ দায়ী করছে বন্ধু রাষ্ট্রটিকেই। পানি আগ্রাসন, বাণিজ্যিক ব্যবধান, ট্রানজিট, ধর্মীয় নিপীড়নসহ এমন অসংখ্য দৃশ্যমান কারণ রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই এবং তা বোঝার জন্য। রয়েছে গুরুতর কিছু অদৃশ্য কারণও। যার ফলেই, ক্রিকেটে বা যে কোন ক্ষেত্রে বিজয়টা হয়ে যায় সব বিজয়ের প্রতিকি রূপ। উদযাপনটাও তাই মন থেকে আসে, প্রকাশের ব্যাপ্তিটাও হয় বেশি।

বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে। পঞ্চাশের প্রবীণ থেকে বারো’র কিশোর সবাই ক্রমাগত দেখে আসছে বঞ্চণা আর অন্যায়ের অনৈতিক রূপ। সুতরাং তাদের কাছে দৃশ্যমান এই রূপটাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায় প্রকাশিত আনন্দের ক্ষেত্রে। অন্য প্রকাশে থাকে শুধু নির্ধারিত বিষয়, খেলার জয়-পরাজয়ের আনন্দ-বেদনাটাই।

তবে শেষ কথায় বলি, এই দেখা ও বোঝার চেষ্টা, এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের কারণটা উপলব্ধি করার চেষ্টা, একপাক্ষিক না হয়ে দু-পক্ষের হলে ভালো হয়। এতে বন্ধুত্বটা হতে পারে সম-মর্যাদার। যার ফলে কাঁধে হাত রেখে হাসিমুখের যাত্রাটাও হতে পারে বহুদূর পর্যন্ত।

পুনশ্চ : স্যালুট, বিশ্বকাপজয়ীদের এবং প্রতিবাদী আর বিজয়ের ধারায় সামিল সব যুবাদের।

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলামিস্ট