২০২২ সালের ডিসেম্বরে কক্সবাজারে ট্রেন চলবে আইপি টিভি রেজিস্ট্রেশন নির্দেশিকা তৈরি হবে মেঘনায় ইলিশ, কেজি ৬০০ টাকা!দেশে করোনায় আরও ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছেইভ্যালির সম্পদ বিক্রি ও হস্তান্তরে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা
No icon

টিকা পরিকল্পনায় গলদ

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে এক সপ্তাহে এক কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে সরকার। দেশে কী পরিমাণ টিকা মজুদ আছে, তা বিবেচনায় না এনেই এ পরিকল্পনা গ্রহণ করায় তাতে গলদ দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া এই পরিমাণ টিকা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত জনবলও নেই। ফলে পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে শুধু আগামীকাল শনিবারই ৩২ লাখ টিকা দেওয়ার নতুন সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। তবে টিকা সংকট নিরসনে গতকাল বৃহস্পতিবার আশার কথা শুনিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ টিকা আসবে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে চারটি কোম্পানির টিকা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হয়। এরই মধ্যে আগামী ৭-১২ আগস্ট দেশজুড়ে গণটিকাদান কর্মসূচির আওতায় এক কোটি টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। এক সপ্তাহে এক কোটি মানুষকে টিকাদানের উচ্চভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করে প্রচারও চালানো হয়। এর পরই সরকারের বোধোদয় হয়েছে যে, সামর্থ্য বিবেচনায় এটি অসম্ভব ও অবাস্তব।

নিবন্ধন ছাড়াই টিকা দেওয়ার যে কথা বলা হয়েছিল তা থেকেও সরে এসেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিবন্ধন ও এনআইডি ছাড়া কেউ টিকা নিতে পারবেন না বলেও জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, আগামী ৭ থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত টিকাস্বল্পতার কারণে গণটিকাদান কর্মসূচি সীমিত করা হয়েছে। আপাতত শুধু ৭ আগস্ট একদিন প্রতিটি টিকাকেন্দ্রে অগ্রিম রেজিস্ট্রেশনের ভিত্তিতে বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ, নারী ও প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ৩০০ জনকে টিকা দেওয়া হবে।এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য দুঃখ প্রকাশও করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। একই সঙ্গে টিকা প্রাপ্তিসাপেক্ষে এই কর্মসূচি পরবর্তী সময়ে শুরু হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।এদিকে ৭ আগস্টের গণটিকাদান কর্মসূচি সফল হওয়া নিয়েও সংশয় আছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে উজিরপুরের ওটরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এমএ খালেক রাড়ী আমাদের সময়কে বলেন, এক দিনে ৬০০ মানুষকে টিকা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। আজ ফরম পূরণের জন্য আমাদের বলা হয়েছে। এদিকে জনগণ আইডি কার্ড নিয়ে আসার পরে সেই সময় ফরম পূরণ করে টিকা দেওয়া অনেকটা অসম্ভব। কারণ এ কাজের জন্য পর্যাপ্ত জনবল দেওয়া হয়নি। ফরম পূরণের বিষয়টি আগেই বলা উচিত ছিল।

তিনি আরও বলেন, ১৮ বছর বয়সীদের টিকা দেওয়া হবে বলে আমাদের জানানো হয়। এখন বলা হচ্ছে, ২৫ বছর বয়সীদের নিচের কাউকে এখন টিকা দেওয়া হবে না। আবার ফরম পূরণের কথাও আগে বলা হয়নি। শেষ মুহূর্তে এসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ-বদল করলে আমদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কারণ জনগণকে সামলাতে (ডিল) হয় আমাদের।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এমনিতে টিকার স্বল্পতা রয়েছে। নিরবচ্ছিন্নভাবে টিকা আমদানিও করা সম্ভব হচ্ছে না। যেখানেই টিকার স্বল্পতার কারণে স্বাভাবিক টিকাদান কর্মসূচি চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে এ পরিকল্পনা নেওয়ার আগে চিন্তাভাবনা করা দরকার ছিল। কত টিকা মজুদ আছে এবং শিগগিরই কত টিকা পাওয়া যাবে, তা জেনে পরিকল্পনা করলে বাস্তবসম্মত হতো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও আইইডিসিআরের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, পরিকল্পনা ছাড়াই এ ধরনের ঘোষণা দিয়ে সেই ঘোষণা থেকে সরে এলে তা জনগণের মাঝে আস্থাহীনতার সৃষ্টি করে বলে মনে করেন। এ জায়গাটায় আমাদের একটু মনোযোগ দিতে হবে যে, ঘোষণা দেওয়ার আগেই অনেক আলোচনা করে সব কিছু ঠিক করে ঘোষণা দিতে হবে। এর মধ্যে টিকার মজুদটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ টিকা না থাকলে তো টিকা দেওয়া যাবে না। তার পর টিকা পরিবহনের ব্যাপার আছে, টিকা যারা দেবে সেটার বিষয় আছে, টিকাকেন্দ্র প্রস্তুতের বিষয় আছে, অর্থ বরাদ্দের ব্যাপার আছে- অনেকগুলো বিষয় এর সঙ্গে জড়িত। সব কিছু ঠিক করে ঘোষণা দেওয়া হলে ঘোষণা দিয়ে আর ফিরে আসতে হতো না। এ ব্যাপারে আমাদের নজর দিতে হবে। এ রকম যেন বিব্রত হতে না হয়। টিকা সংগ্রহের ব্যাপারে তিনি বলেন, সরকারের উদ্যোগ আছে। তবে টিকা পেতে হবে। না পেলে তো আর করার কিছু থাকে না।

সূত্র জানায়, আগামী ৭ আগস্ট এক দিনের গণটিকাদানের কর্মসূচির প্রস্তুতি সভা হয়েছে গত বুধবার। সভায় প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, পুলিশ সুপার (এসপি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। শনিবার প্রায় ৩২ লাখ ৩০ হাজার ৬০০ জনকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। সারাদেশে ৮১ হাজার ১৬৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী এ কাজে নিয়োজিত থাকবেন।সূত্র জানায়, দেশে এ পর্যন্ত মোট টিকা এসেছে ২ কোটি ৫৬ লাখ ৪৩ হাজার ৯২০টি। এর মধ্যে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ১ কোটি ১৮ লাখ ২৬ হাজার ২০০, ফাইজারের ১ লাখ ৬২০, সিনোফার্মের ৮১ লাখ এবং মডার্নার ৫৫ লাখ ডোজ; যা প্রত্যেককে দুই ডোজ করে মোট ১ কোটি ২৮ লাখ ৫০ হাজার লোককে দেওয়া সম্ভব। এর মধ্যে ৪ আগস্ট পর্যন্ত করোনা টিকার জন্য নিবন্ধন করেছে ১ কোটি ৭০ লাখের মতো।

এ পর্যন্ত প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৯ হাজার ৯৫৩ জনকে। আর দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে ৪৪ লাখ ১৬ হাজার ১৩১ জনকে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এ জন্য দুই ডোজের টিকার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ২৭ কোটি ৪ লাখ ১ হাজার ৬০০ ডোজ। তবে এক ডোজ টিকার ক্ষেত্রে কিছু কম প্রয়োজন হবে। সরকার জনসন অ্যান্ড জনসনের এক ডোজের টিকা সাত কোটি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে ক্ষেত্রে মোট টিকার প্রয়োজন হতে পারে ২০ কোটি ৪ লাখ ১ হাজার ৬০০ ডোজ। এ হিসাবে এখনো বিপুলসংখ্যক টিকা সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।সূত্র জানায়, এই বিপুল প্রয়োজনীয়তার বিপরীতে আগামী সপ্তাহে টিকার বৈশ্বিক জোট কোভ্যাক্স থেকে চীনের সিনোফার্মের ৩৪ লাখ টিকা আসছে। এ মাসেই কোভ্যাক্স থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ১০ লাখ ডোজ আসার কথা রয়েছে।**আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে কোভ্যাক্স থেকে ৬০ লাখ ডোজ ফাইজারের টিকা আসার কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন। গতকাল তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেন, আমরা চীনের সিনোফার্মের কাছ থেকে সাড়ে সাত কোটি টিকা কেনার অর্ডার দিয়েছি। এ ছাড়া চীনের সঙ্গে টিকার সহ-উৎপাদনের জন্য আমাদের দেশীয় কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি যে কোনো দিন হবে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে টিকার বিষয়ে চুক্তি চূড়ান্ত।