ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে অসন্তোষ রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে শুধু এ দুটি নয়, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণের দাবিও ভোটারদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টিকে বড় পরাজয়ের মুখে পড়তে হয়েছে। ফলাফলে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও উচ্চকক্ষ সিনেট—উভয়টির নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়বে। নির্বাচনের ফলকে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও তাঁর প্রশাসনের নীতির প্রতি ভোটারদের অনাস্থার প্রকাশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে ভ্যান্স বলেন, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যারা তাঁকে ও ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই এবার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন করেছেন। তাঁর ভাষায়, রিপাবলিকানদের ভোটারভিত্তি ধরে রাখার বিষয়ে দলটির হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের ভুল ছিল। নির্বাচনের ফল আগাম আঁচ করতে পেরেছিলেন—এমন একজন জনমত জরিপকারীর তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, দল ছেড়ে যাওয়া ভোটারদের কাছে ফিরে আসার উপায় জানতে চাইলে চারটি বিষয় সামনে আসে।
ভ্যান্সের দেওয়া তালিকায় রয়েছে—ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দেওয়া, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ এবং ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ধরন পরিবর্তন করা। অর্থাৎ, যুদ্ধ ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে অসন্তোষের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপও রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তিনি।
ইরান সংঘাত কূটনৈতিকভাবে সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এক রক্ষণশীল টেলিভিশন ব্যক্তিত্বের পরামর্শের কথাও পোস্টে উল্লেখ করেন ভ্যান্স। তিনি লেখেন, ওই ব্যক্তির রাজনৈতিক পরামর্শ সঠিক ছিল। এরপর সরাসরি বলেন, ‘আমরা যে হেরেছি, তার কারণ এই যুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট নিজেও গত রাতে এমনটাই বলেছেন।’ যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং তা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি দেওয়ার পরিবর্তে ভ্যান্সের এই বক্তব্যকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য দূরত্ব তৈরির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্পও স্বীকার করেন, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় রিপাবলিকান প্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের পক্ষে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি তিনি। বুধবার ভ্যান্সের মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্টের মূল্যায়নে তাঁর আপত্তি নেই। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে সামরিক অভিযান প্রয়োজন ছিল এবং সুযোগ পেলে তিনি আবারও একই সিদ্ধান্ত নিতেন।
নির্বাচনের পর প্রকাশিত জনমত জরিপেও ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষের চিত্র উঠে এসেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক লাখের বেশি ভোটারের ওপর পরিচালিত জরিপে প্রায় ১০ জনের ছয়জন বলেছেন, ইরানে সামরিক অভিযান চালানো যুক্তরাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তবে জরিপ অনুযায়ী, যুদ্ধ ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না; জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি দুর্নীতি ভোটারদের কাছে আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। যুদ্ধ শুরুর আগে এ ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন ভ্যান্স—এমন খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তবে যুদ্ধ শুরুর পর তিনি প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেননি; বরং গত গ্রীষ্মে এক সাক্ষাৎকারে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারলে যুদ্ধকে সার্থক বলা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছিলেন। পরে ইরানের সঙ্গে সংঘাত অবসানে আলোচনার উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নেন তিনি।
ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নেও ট্রাম্প ও ভ্যান্সের অবস্থানে পার্থক্য স্পষ্ট। ট্রাম্প ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি জোরালো সমর্থন জানিয়ে এলেও ভ্যান্স তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। গত মাসে ইসরাইলের জাতীয় নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানালেও ভ্যান্স তা করেননি। গত জুনে ইরান যুদ্ধ অবসানে ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বিরোধিতা করায় ইসরাইলি সরকারের কয়েকজন সদস্যের সমালোচনা করেন তিনি। জুলাইয়ে এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স অভিযোগ করেন, ইসরাইলি সরকারের কিছু অংশ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে মার্কিন জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে।
গত মাসেও মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ইসরাইলের অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ওপর প্রাধান্য দেওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেন ভ্যান্স। তাঁর বক্তব্য, ওয়াশিংটনকে অবশ্যই নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত ভ্যান্সের এসব বক্তব্যকে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে নিজের অবস্থানের পার্থক্য তুলে ধরার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।
সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল, রয়টার্স