ভারতের সীমান্তঘেঁষা এলাকায় এক দিনে ১০৮টি বৌদ্ধ প্যাগোডা নির্মাণ করেছে ভুটান। রোববার দেশটির ৪০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবী এসব স্থাপনা নির্মাণে অংশ নেন। ভুটানের নতুন ‘মাইন্ডফুলনেস’ শহর গড়ে তোলার জায়গায় নদীর তীর ধরে ১২ কিলোমিটার এলাকায় প্যাগোডাগুলো স্থাপন করা হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে নেওয়া উচ্চাভিলাষী এই শহর প্রকল্পের সঙ্গে ধর্মীয় ঐতিহ্যকে যুক্ত করতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিটি প্যাগোডার উচ্চতা ১৫ মিটার বা প্রায় ৫০ ফুট। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যরাতের পর কাজ শুরু করে ৪০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবী এসব স্থাপনা নির্মাণে অংশ নেন। তাদের ভাষায়, এগুলো পাথর ও মাটিতে স্থায়ী রূপ পাওয়া প্রার্থনার প্রতীক। বৌদ্ধধর্মে ১০৮ সংখ্যাটিকে পবিত্র মনে করা হয়। ভুটানে এই ধর্ম ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
অনুষ্ঠানে ২ দুই লাখ মানুষ অংশ নেন। দেশটির কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা এএফপিকে এ তথ্য জানিয়েছেন। এই সংখ্যা ভুটানের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক বলেন, ‘এক দিনে ১০৮টি প্যাগোডা নির্মাণের উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম। কিন্তু সবকিছু সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এ জন্য আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।’
রাজার পরিকল্পনায় এবং ডেনমার্কের স্থপতিদের নকশায় গড়ে উঠছে গেলে ফু মাইন্ডফুলনেস সিটি। ভুটানের নেতারা আশা করছেন, এই শহর দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করবে এবং তরুণদের দেশেই থাকার ব্যাপারে উৎসাহিত করবে। টেকসই ব্যবসা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, শিক্ষা, পর্যটন ও আর্থিক সেবা খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও এ প্রকল্পের লক্ষ্য।
ভুটান বর্তমানে নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বেকারত্ব বৃদ্ধি, জন্মহার কমে যাওয়া এবং দক্ষ কর্মীদের ব্যাপকভাবে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া।
দক্ষিণ ভুটানে ভারতের সীমান্তঘেঁষা এলাকায় শহরটি গড়ে তোলা হচ্ছে। বর্তমানে এলাকাটি প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাসের একটি ছোট শহর। রাজধানী থিম্পু থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২৪০ কিলোমিটার।
ভুটানের জনসংখ্যা ৮ লাখের কিছু কম। চীন ও ভারতের মাঝখানে অবস্থিত স্থলবেষ্টিত এই হিমালয় রাষ্ট্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ‘মোট জাতীয় সুখ’ বা গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতির জন্য পরিচিত।
২০২৪ সালে রাজকীয় সনদের মাধ্যমে রাজা এই বিশেষ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেন। তখন তিনি বলেছিলেন, এর উদ্দেশ্য হলো ‘একটি প্রাণবন্ত অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা’।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ৬৫ বছর বয়সি নিমা গেলতশেন বলেন, ‘এই দিনটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমাদের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ তিনি অর্গানাইজেশন ফর ইয়ুথ এমপাওয়ারমেন্টের প্রধান। সংস্থাটি ভুটানের তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজে পেতে সহায়তা করে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়েও পরিকল্পনা
বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, নতুন শহরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ভুটান আকর্ষণ করতে পারবে কি না। তবে ভারতের ধনকুবের গৌতম আদানি এ প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন। বন্দর থেকে বিদ্যুৎ খাত পর্যন্ত বিস্তৃত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রধান আদানি জানুয়ারিতে প্রকল্পটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন।
প্রকল্প এলাকাটি ভারতের আসাম রাজ্যের রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে ২০২৯ সালে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালুরও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভুটানের ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংক্রান্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও এই প্রকল্পের যোগ রয়েছে। দেশটি উদ্বৃত্ত জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করে বিটকয়েন উৎপাদন করছে। শহরটির উন্নয়নে ডিজিটাল সম্পদ ব্যবহারের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে ভুটান।
রোববারের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সি বিষ্ণু মায়া মোকতাং নতুন শহরটি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, শহরটি দেখে যাওয়ার মতো দীর্ঘ জীবন পাব। আমার মা-বাবা অল্প বয়সে মারা গেছেন। তারা কখনো এই শহর দেখে যেতে পারতেন না। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে।’