ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ কয়েকটি দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া এবং পার্শ্ববর্তী জেলা গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে গতকাল রোববারও বিক্ষোভ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। এসময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়।মিরপুর, গাজীপুরের বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। মিরপুরে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুনও দেন বিক্ষোভকারীরা। সহিংসতার কারণে তিনটি মেট্রোস্টেশন ও ট্রেন চলাচল কয়েক ঘণ্টা বন্ধ ছিল।গাজীপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। এ সময়ও ওই এলাকায় কিছু কারখানায় ভাঙচুর চালান বিক্ষোভকারীরা। সাভার ও আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক সাত ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন শ্রমিকরা। কালিয়াকৈরে ব্যাংকের শাখায় হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে।গতকাল সরকার শ্রমিকদের দাবি করা মজুরি বোর্ড গঠন করে। আগের দিন এ সংক্রান্ত ঘোষণা দিয়েছিলেন শ্রমমন্ত্রী। এর পরও বিভিন্ন দাবিতে সকাল থেকে আন্দোলনে নামেন শ্রমিকরা। ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার পাশাপাশি তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ ও ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগ।
গতকাল দিনভর বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও আগুনের ঘটনায় ৫২৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এসব কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা ৯ লাখ ৮৭ হাজার ১৯০। তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনের সময় বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে পুলিশ আটক করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, মিরপুর ও গাজীপুরে ৪৯ জনকে আটক করেছে তারা। নতুন মজুরির দাবিতে কয়েক দিন ধরেই ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যে রোববার সকাল থেকে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে রাস্তায় নেমে এসে অবরোধ তৈরি করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সন্ধ্যায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে এ বৈঠক হয়। কারখানা চালু রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া চলমান পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে গতকাল বিকেলে উত্তরার কার্যালয়ে মতবিনিময়ের আয়োজন করে বিজিএমইএ।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ঢাকা ও গাজীপুরে এই সহিংস শ্রমিক বিক্ষোভে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা যুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সাজমুল ইসলাম একটি মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।পুলিশ বলছে, মিরপুরে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সক্রিয় কর্মী। তারা তৈরি পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে নাশকতার চেষ্টা চালান।
মিরপুরে দফায় দফায় সংঘর্ষ
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মিরপুর-১ ও ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। পরে মিরপুর-১১, ১২ নম্বরসহ আশপাশ এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তা অবরোধ করায় ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে সাধারণ পথচারী ও যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। দুপুর ১টার দিকে পুলিশের ধাওয়ার মুখে আন্দোলনকারীরা রাস্তা ছেড়ে অলিগলিতে চলে যান। এ সময় গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক হয়।নিরাপত্তার জন্য মিরপুর-১০, ১১ ও পল্লবীর মেট্রোস্টেশনের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে প্রায় আড়াই ঘণ্টা ওই তিনটি স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ থাকে।পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রথমে মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় পোশাক শ্রমিকরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এর পরপরই মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে কয়েকশ শ্রমিক রাস্তা অবরোধ করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। বেলা সোয়া ১১টার দিকে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের রাস্তা ছেড়ে দিতে অনুরোধ করে। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বেধে যায়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ তাদের ওপর জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। তখন তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন গলিতে অবস্থান নেন।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের মিরপুর স্টেশনের দুটি ইউনিট আগুন নেভাতে গেলে তাদের ওপর হামলা চালান আন্দোলনকারীরা। ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। বাধ্য হয়ে ফায়ার ব্রিগেড ফিরে যায়।ফায়ার সার্ভিসের মিরপুর স্টেশন অফিসার মশিউর রহমান বলেন, খবর পেয়ে আমাদের দুটি ইউনটি আগুন নেভানোর উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছলে আন্দোলনকারীরা হামলা চালায়। গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে আমাদের ফিরে আসতে হয়।সরেজমিন দেখা যায়, মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ২০১ ও ২০২ নম্বর পিলারের মাঝে রাস্তার ওপর পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ায় তাপে স্টেশনের পানির লাইনের পাইপ পুড়ে গেছে।মিরপুর-১১ মেট্রোস্টেশনের নিরাপত্তাকর্মী খালিদ হাসান বলেন, আন্দোলনের সময় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর পর স্টেশনে ওঠানামার সব গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুপুর আড়াইটার পর দুটি গেট খুলে দিলে ওই স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা শুরু হয়।দুপুর ১২টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বরের মেট্রোস্টেশনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, অফিসের কাজে মতিঝিলে যাওয়ার জন্য তিনি মেট্রোস্টেশনে যান। কিন্তু স্টেশনের সব গেট বন্ধ পান। তিনি বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ কেন ভোগান্তির শিকার হবো? মেট্রোরেলে মতিঝিলে যেতে যে সময় লাগবে, তার কয়েক গুণ সময় ব্যয় হবে সড়কপথে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েন পথচারী ও বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীরা। বিভিন্ন আবাসিক এলাকার প্রবেশমুখের নিরাপত্তা গেট তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। এ কারণে ওইসব এলাকায় রিকশা ও মোটরসাইকেল নিয়েও প্রবেশ করা যায়নি।ডিএমপির ট্রাফিক মিরপুর বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার পরিত্রাণ তালুকদার বলেন, আন্দোলনের কারণে কয়েকটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর ১টার দিকে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক হয়।ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান বলেন, দুপুর ১টার দিকে মিরপুর-১২ নম্বরের একটি গলি থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ১১ কর্মীকে আটক করা হয়। প্রায় দেড়শ নেতাকর্মী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার রাত ৮টায় বলেন, পুলিশের কাজে বাধা, গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলার প্রক্রিয়া চলছে। আটক ব্যক্তিদের ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে।