ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজপথে নেমেছেন তরুণেরা। কোথাও শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে, কোথাও আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের প্রতিবাদে, আবার কোথাও দুর্নীতি ও সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন তারা। এসব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে জেনারেশন জেড বা জেন জি নামে পরিচিত তরুণ প্রজন্ম। সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির পাশাপাশি এসব বিক্ষোভ সামনে নিয়ে এসেছে বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে জমে থাকা অসন্তোষ।দেশভেদে বিক্ষোভের কারণ ভিন্ন হলেও তরুণদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে কিছু অভিন্ন বিষয়। তারা মনে করছেন, আগের প্রজন্মের মতো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও উন্নত জীবন পাওয়ার সুযোগ তাদের সামনে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে তার বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা আবাসনসংকটবিরোধী বিক্ষোভের অন্যতম অনুঘটক হয়ে ওঠে। ফ্রান্সে ধর্মঘটরত শিক্ষকদের সমর্থনে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। আর আলবেনিয়ায় কয়েক মাস ধরে চলা ছাত্রবিক্ষোভের সূত্রপাত হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনপুষ্ট একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্কের পর।
এসব আন্দোলন একে অপরকেও প্রভাবিত করছে। ইতালি ও গ্রিসের বিক্ষোভকারীরা তাদের স্লোগানে ফ্রান্সের আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেছেন। স্পেনে আবাসনসংকটের প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে পর্তুগালেও। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ছাত্রসংগঠন নিজেদের অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনের কৌশল পরস্পরের সঙ্গে ভাগাভাগি করছে বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রধান ছাত্রসংগঠন ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস দ্য ব্রিতো।তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের মধ্যে পার্থক্যের চেয়ে মিলই বেশি। শিক্ষায় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আবাসনসংকটের বিষয়গুলোও সামনে আসছে।ইতালির ছাত্রসংগঠনের নেতা সাবরিনা ব্রিজোলাও একই ধরনের দাবি তুলে ধরেছেন। গত সপ্তাহান্তে এক সমাবেশে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ কর্মসংস্থান, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।ইউরোপিয়ান করেসপন্ডেন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক জুলিয়াস ফিন্টেলমানের মতে, এসব বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে তরুণদের মধ্যে এমন একটি হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে যে ইউরোপের রাজনীতি নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না।শিক্ষা ও আবাসনসংকটে বাড়ছে ক্ষোভ ফ্রান্সে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে শিক্ষাবর্ষ শুরুর সময় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। গত নয় বছর ধরে শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ থেকে এ ধরনের আন্দোলন হয়ে আসছে। তবে এবার আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো, শিক্ষকদের পেছনে বরাদ্দ বাড়ানো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং তরুণদের ওপর পুলিশি সহিংসতা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।অ্যালিস দ্য ব্রিতোর ভাষ্য, মানুষ এখন আর উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত।গ্রিসেও হাজারো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিতে মিছিল করেছেন। এথেন্সে পার্লামেন্টের সামনে সমবেত একদল বিক্ষোভকারী স্লোগান দেন, গ্রিস থেকে ফ্রান্স- আমরা চাই সরকারি ও বিনা মূল্যের শিক্ষা।ইতালিতেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ফ্রান্সের বিক্ষোভের প্রভাব দেখা গেছে। গত ৭ অক্টোবর রোমের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় দখলে নেওয়ার পর শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মকাণ্ডের পক্ষে দেওয়া বিবৃতির শুরুতেই লিখেছিলেন, ফ্রান্সের মতো ।তবে ইতালির সরকার দুই দেশের পরিস্থিতির মধ্যে মিলের বিষয়টি নাকচ করার চেষ্টা করেছে। দেশটির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা দাবি করেন, ফ্রান্সের পরিস্থিতি ইতালির চেয়ে আলাদা। ফরাসি বিক্ষোভের পেছনে অভিবাসীদের দ্বিতীয় প্রজন্মকে শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার সমস্যা রয়েছে বলে দেশটির ডানপন্থীদের একটি দাবিও তিনি পুনরাবৃত্তি করেন।