ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতিজনিত বিক্ষোভ, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং প্রতিদ্বন্দ্বী উৎপাদক দেশগুলোর সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা।রপ্তানি কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতা দেশের সর্ববৃহৎ রপ্তানি আয়ের খাতটির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) হওয়ায় এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দেশের রপ্তানিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের ১৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ইউরো থেকে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে ১১ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। পাশাপাশি প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরো হয়েছে, যা ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম। অর্থাৎ রপ্তানি আয় কমার ক্ষেত্রে পণ্যের গড় মূল্য হ্রাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি : ইউরোপ-বাংলাদেশ ফেডারেশন অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির জ্যেষ্ঠ পরিচালক ও স্টাইলিশ গার্মেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানির দামও বেড়েছে। তিনি বলেন, এর ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি ফ্রান্স ও ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ উসকে দিচ্ছে এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক দেশে রপ্তানি হয়, যার মধ্যে ফ্রান্স ও ইতালিও রয়েছে।সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিক্ষোভ কমে আসতে পারে বলে তিনি আশা করছেন। তবে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোগব্যয় ও বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা কমে যেতে পারে। তিনি বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে ভোক্তারা পোশাক কেনা কমিয়ে দিতে পারেন। এতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ওপর আরও চাপ তৈরি হবে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে আরও কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলবে। তাঁর মতে, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ঝুঁকি এখনো কাটেনি। সংকটে থাকা কারখানাগুলোর জন্য স্বচ্ছ ও নমনীয় প্রণোদনা চালু করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল গ্রহণের পরামর্শ দেন।
সালাউদ্দিন বলেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। মজুরি সমন্বয়ের বিষয়েও শ্রমিক, মালিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে বাস্তবসম্মত আলোচনা প্রয়োজন, যাতে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে না পড়ে। কর্মসংস্থান সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে বাংলাদেশকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে পণ্য সরবরাহকারী রপ্তানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। শীতকালে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা ও দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও চলমান অস্থিরতা বিবেচনায় ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য আগামী দিনগুলোতে সংকুচিত হতে পারে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।তিনি বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ আরও বেশি। কারণ দেশের রপ্তানি বাজার কয়েকটি অঞ্চলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে বড় কোনো বাজার গড়ে তুলতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।