NEWSTV24
সুন্দরবনের পাশে এলএনজি টার্মিনাল করার পরিকল্পনা
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনাল বা ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই গ্যাস মোংলায় নিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হবে।টার্মিনাল করার লক্ষ্য নিয়ে গত আগস্ট মাসে আকরাম পয়েন্ট এলাকা পরিদর্শন করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী, বিদ্যুৎমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্থানটি পরিদর্শনের কথা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে স্থান নির্বাচন হলে সম্ভাব্যতা যাচাইসহ অন্যান্য কাজ শুরু হবে।গতকাল সোমবার রাজধানীতে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত আলোচনা সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, খুলনার কাছে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খালাসের সুবিধাসম্পন্ন একটি আধুনিক টার্মিনাল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।খুলনার কাছে ২০ মিটার ড্রাফটের একটি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল ও এলএনজি খালাসের সুবিধাসহ আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। আকরাম পয়েন্ট সুন্দরবনের ভেতরে পশুর, শিবসা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনার কাছাকাছি অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এর ৬০ কিলোমিটার উজানে মোংলা বন্দর এবং ৩০ কিলোমিটার ভাটিতে সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট। আকরাম পয়েন্টের দুপাশে সুন্দরবনের দুই বন্যপ্রাণী অভয়রাণ্য এবং উত্তর-পশ্চিমে শিবসা ডলফিন অভয়ারণ্য অবস্থিত। এ জন্য ওই এলাকায় গাঙ্গেয় ডলফিন (শুশুক) এবং ইরাবতী ডলফিনের অবাধ বিচরণ দেখা যায়।

২০২৩ সালে প্রণীত পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালায় গ্যাস টার্মিনাল এবং ২৫ কিলোমিটারের ঊর্ধ্বে গ্যাস বিতরণ পাইপলাইনকে পরিবেশের জন্য সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা লাল শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। ১৯৯৯ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে এই সীমানার ভেতর বনের জন্য ক্ষতিকারক এমন কোনো শিল্প স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর আগে ২০০৫ সালে ওই এলাকায় গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করে নেতিবাচক প্রতিবেদনের কারণে সরে আসে তৎকালীন সরকার।খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুণ চৌধুরী বলেন, আকরাম পয়েন্টে প্রস্তাবিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগটি অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক হলেও সুন্দরবনের পরিবেশগত সংবেদনশীলতার কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্য প্রকল্প গ্রহণের আগে অবশ্যই যথাযথভাবে পরিবেশ প্রতিক্রিয়া যাচাই (ইআইএ) করতে হবে। ইআইএতে যেসব নেতিবাচক বিষয় উঠে আসবে, তা দূর করতে সঠিকভাবে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (ইএমপি) গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। তা না হলে এটি সুন্দরবনের প্রতিবেশ, বন্য ও জলজ প্রাণীর বাস্তুসংস্থানকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে।বিদেশ থেকে আনার জন্য গ্যাসকে মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঠান্ডা করে তরল করা হয়। এতে এর আয়তন ৬০০ ভাগ কমে যায়। বড় ট্যাঙ্কারে এই গ্যাস সমুদ্রপথে দেশে আনা হয়। সেই গ্যাসকে পরে স্বাভাবিক গ্যাসে পরিণত করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।এই রূপান্তরের জন্য স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) নির্মাণ করা হয়, যা এলএনজি টার্মিনাল নামে পরিচিত। সমুদ্রপথে জাহাজে এলএনজি আসায় সাগরে ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ সুবিধাজনক। বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল আছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত মহেশখালী ফ্লোটিং এলএনজি টার্মিনাল (এমএলএনজি) ২০১৮ সালে চালু হয়। বেসরকারি সামিট গ্রুপ ও এক্সিলারেট এনার্জি যৌথভাবে সামিট এলএনজি টার্মিনাল (এসএলএনজি) চালু করে ২০১৯ সালে।

গত ৯ সেপ্টেম্বর সংসদে দেশের জ্বালানি সংকট মেটাতে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানান, পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের সুবিধাজনক কোনো স্থানে জরুরি ভিত্তিতে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।এর আগে গত ১৬ আগস্ট মোংলায় একটি অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, মোংলা বন্দরের অদূরে আকরাম পয়েন্টে এলএনজি স্টেশন হবে। সেখান থেকে পাইপলাইনে গ্যাস মোংলায় আনা হবে। এরপর মোংলায় সেই গ্যাস দিয়ে হবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র।পরদিন খুলনায় মোংলা বন্দরের অংশীজন সম্মেলনে একই তথ্য জানিয়ে নৌমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা কালকে (নৌমন্ত্রী, বিদ্যুৎমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী) আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত গিয়েছি। ওখানে যে ড্রাফট (গভীরতা) আমরা দেখেছি, আমার কাছে মনে হচ্ছে, এফএসআরইউ যেটা আমরা স্থাপন করতে যাচ্ছি, সেটা মোংলায় হবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে আমরা এ প্রকল্প গ্রহণ করব।বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, ভাসমান টার্মিনাল সাগরে হওয়ায় স্থান নির্বাচনের প্রস্তাব নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে আসতে হয়। তারা স্থান চূড়ান্ত করে জানানোর পরই অন্য কার্যক্রম শুরু হয়।