NEWSTV24
এল নিনোতে বাড়তে পারে খরা ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:১১ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশে বাড়ছে নানা ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি। কখনও তীব্র তাপপ্রবাহ, কখনও দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার অতিবৃষ্টি ও বন্যা বিপর্যস্ত করছে মানুষের জীবন ও জীবিকা। এর সঙ্গে রয়েছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি। আগামীতে শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কা এগুলোতে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দুর্যোগ মোকাবিলায় কেবল ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ওপর নির্ভর না করে আগাম প্রস্তুতি, ঝুঁকি হ্রাস এবং মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।তাদের মতে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এখনও ত্রাণকেন্দ্রিকতার প্রবণতা রয়েছে। অথচ দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি, আগাম সতর্কবার্তা এবং কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ঘর থেকেই শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি । জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক দপ্তর ইউএনডিআরআরের নির্ধারিত প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বাংলাদেশেও দিবসটি পালনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দিবসের মূল অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালিত হবে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে পূর্বাভাস দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর প্রভাবে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে একই রকম হয় না। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশে শুষ্কতা, খরা ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বন্যা বা শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি থাকবে না। সমুদ্রের তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা বিবেচনায় রাখতে হবে।তিনি বলেন, একটি দুর্যোগের প্রভাব অন্য খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার একাধিক দুর্যোগ একই সময়ে দেখা দিলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়ে যায়। যেমন, তাপপ্রবাহের সঙ্গে খরা দেখা দিলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। পানির সংকট তৈরি হলে সেচের চাহিদা বাড়ে, বাড়ে কৃষকের উৎপাদন খরচও। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যের বাজারে পড়তে পারে। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগ এবং নিরাপদ পানির সংকটে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। আগামী বছরে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।

গবেষণা সংস্থা হাইড্রো-ক্লাইমেট অ্যান্ড ওশান সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, বাংলাদেশের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও শুষ্ক সময়ের সঙ্গে এল নিনো এবং প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের অবস্থার সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৫১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের পাঁচটি উপকূলীয় জেলার ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এল নিনোর বছরে স্বাভাবিক বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা গড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।তিনি বলেন, এল নিনোর পূর্বাভাস পাওয়া গেলে আগেভাগেই কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক আবহাওয়ার তথ্য ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ড. সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, এল নিনোর বছরে বৃষ্টিপাতের ধরন অনেক সময় অনিয়মিত হয়ে পড়ে। কোনো অঞ্চলে বৃষ্টি কম হতে পারে, আবার অন্য অঞ্চলে অতিবৃষ্টি দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উজানের বৃষ্টিপাত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হিমালয়ের পাদদেশ ও নদীর উজানের অববাহিকায় অতিবৃষ্টি হলে সেই পানি ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও মেঘনা নদী দিয়ে বাংলাদেশে নেমে আসে। তিন নদীর পানি একই সময়ে বেড়ে গেলে বন্যার তীব্রতা অনেক বেড়ে যেতে পারে। এল নিনোর বছরেও বাংলাদেশে বড় বন্যা হতে পারে।তিনি বলেন, বৃষ্টি, বন্যা ও খরার মৌসুমি পূর্বাভাস আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। মার্চ-এপ্রিল কিংবা মে মাসে খরা বা তীব্র গরমের আশঙ্কা থাকলে আগেই কৃষকদের সতর্ক করা সম্ভব হবে।দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সমকালকে বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে প্রকৃতির সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম করতে হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী অবস্থান, অসংখ্য নদনদী, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং বিপুল জনগোষ্ঠীর চাপ দেশকে বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত করেছে।