NEWSTV24
ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছেই গেল এনসিটি
শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত বিদেশি অপারেটরকেই দেওয়া হলো। রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন ও বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির মুখেই দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছরের জন্য দায়িত্ব দিয়ে চুক্তি করেছে সরকার।গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। চুক্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন প্রতিষ্ঠানটির সাবকন্টিনেন্ট, সেন্ট্রাল এশিয়া ও মিসর অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিজওয়ান সুমার।নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসানের উপস্থিতিতে চুক্তি সই হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এসা কাজিম, বাংলাদেশে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলি আল হামুদি, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী প্রমুখ।

অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে বিক্ষোভ করে বামপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। এ সময় পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, এনসিটি পরিচালনার ভার বিদেশিদের দিলে চট্টগ্রাম বন্দর লোকসানের দিকে যাবে। ভূ-রাজনৈতিকভাবেও বাংলাদেশের বিপদের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা আছে। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার এবং বিপজ্জনক পণ্য খালাসের আশঙ্কা করছেন তারা।ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, এনসিটির আধুনিকায়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় এই চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টার্মিনালের আয় বা রয়্যালটির একটি অংশ পাবে। গড় টার্মিনাল আয়ের ওপর নির্ভর করে প্রতি কনটেইনারের জন্য এই অংশ ৪০ শতাংশ থেকে ৬৭ শতাংশের মধ্যে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট ফি দেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড।

চুক্তি অনযায়ী, নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন, প্রযুক্তি সংযোজন ও পরিচালন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে এনসিটিকে আধুনিক করতে প্রথম ১০ বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। চুক্তিতে বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার নিশ্চয়তা রাখা হয়েছে। নতুন কোনো টার্মিনাল চালু হলে এই ন্যূনতম পরিমাণ ১০ লাখ টিইইউতে নামিয়ে আনার সুযোগ থাকবে।চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে সংবাদ সম্মেলনে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকারের লক্ষ্য বিভিন্ন টার্মিনালে একাধিক আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাপ্লাই চেইনে স্থিতিশীলতা আনা।এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এই চুক্তির কারণে এনসিটিতে কর্মরত কোনো কর্মী ছাঁটাই করা হবে না। তাদের বেতন-ভাতাও কমবে না। ডিপি ওয়ার্ল্ড চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা থাকবে বলে জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী।ডিপি ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান এসা কাজিম বলেন, বাণিজ্য ও উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমে বাড়ছে। এই চুক্তির মাধ্যমে এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক বন্দর, লজিস্টিকস অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থার সেবা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। ফলে বিশবাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সংযোগ আরও সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন হবে।

সিপিএর চেয়ারম্যান বলেন, এই চুক্তি টার্মিনালের পরিচালন দক্ষতা বাড়াবে, লজিস্টিকসের প্রতিবন্ধকতা কমাবে এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযোগ আরও জোরদার করবে। দেশীয় শিল্পের সহায়ক পরিবেশ তৈরি ও পণ্য পরিবহন আরও গতিশীল করার মাধ্যমে এই অংশীদারিত্ব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করবে।ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, দেশের বাণিজ্যকে বৈশ্বিক গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিতেই এনসিটির পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বন্দরে দ্রুত কার্যক্রম, শক্তিশালী সংযোগ ও উন্নত সেবা পাওয়া যাবে। বন্দর ব্যবস্থাকে এমন সক্ষমতায় উন্নীত করা হবে, যা বাণিজ্য সম্প্রসারণের চাহিদা পূরণ করতে পারে।তবে চুক্তিকে উন্নয়নের নামে নব্য উপনিবেশায়ন বলে মন্তব্য করেছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।  তিনি বলেন, বন্দরের যেসব সমস্যার যুক্তি টানা হয়েছে, সেগুলোর কারণ সমুদ্র গভীরতা, কাস্টমস ও আমলাতন্ত্র। এগুলোর সমাধান সরকারের হাতে; বিদেশি কোম্পানির হাতে নয়। সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এভাবে গোপন তৎপরতায় বিদেশি কোম্পানি লাগবে, মাশুল বাড়াতে হবে এ যুক্তি মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়।প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্বচ্ছ প্রক্রিয়া কিংবা কোনো দরপত্র না ডেকেই সরকার এই চুক্তি করছে মন্তব্য করে অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, মানুষ জানে না এতে কী কী শর্ত আছে, লাভ বা ক্ষতি কী, কোন আইন অনুসরণ করে চুক্তি হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, রাজস্ব, শ্রমবাজার বা নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব কী হবে।তিনি বলেন, এনসিটির মালিকানা থাকবে বাংলাদেশের এ যুক্তি প্রতারণামূলক। কাগজে থাকলেই মালিকানা বাস্তবে থাকে না; নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালন ক্ষমতাই প্রকৃত মালিকানা। বিশ্বের কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্র তার প্রধান বন্দরকে এভাবে বিদেশিদের হাতে তুলে দেয় না। এটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।

চুক্তির বিষয়ে যা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ

ইনভেস্ট বাংলাদেশ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, চুক্তির ফলে এনসিটি বিদেশিদের কাছে চলে যাচ্ছে না। এর মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডকে প্রাথমিকভাবে ১৫ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে।এতে আরও বলা হয়, চুক্তিতে কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর (কেপিআই), নিয়মিত প্রতিবেদন এবং লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মনিটরিং, নিরীক্ষা ও নির্ধারিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে তদারকি অব্যাহত রাখবে। এতে উন্নত টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জাহাজ ও ট্রাকের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমবে। ট্রাকের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় ধীরে ধীরে ৯০ মিনিটে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। কাগজবিহীন কার্যক্রম ও অটোমেশনের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও সহজ হবে।ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, ইমিগ্রেশন, কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিরাপত্তা প্রটোকল আগের মতোই বলবৎ থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম বন্দর ও লজিস্টিকস অপারেটর। তারা ৪০টির বেশি দেশে ৮০টির বেশি সামুদ্রিক ও অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল পরিচালনা করে। বিশ্বের মোট কনটেইনার চলাচলের প্রায় ১০ শতাংশ হয় এ প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বন্দর পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের অভিজ্ঞতা রয়েছে। চুক্তির মেয়াদ শেষে ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনালটি বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।