NEWSTV24
সমুদ্রপথে পণ্য আমদানির খরচ ৬৬ শতাংশ বেড়েছে
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৫০ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য গভীর সংকটে পড়েছে। ৯ মাসের ব্যবধানে জাহাজে এক কনটেইনার (গড়ে ১৪ টন) পণ্য এনে বন্দর থেকে খালাস করতে সব মিলিয়ে এখন ব্যবসায়ীদের বাড়তি খরচ হচ্ছে গড়ে ৬৬ শতাংশ।গত ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম বন্দর ২৩ খাতে এক লাফে মাশুল বাড়িয়ে ছিল ৪১ শতাংশ। বন্দরে ২০ ফুট এককের একটি আমদানি কনটেইনারেই বাড়তি গুনতে হচ্ছে পাঁচ হাজার ৭২০ টাকা। এই ধকল সামলে ওঠার আগেই গত ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালিতে শুরু হয় অস্থিরতা। সেটির প্রভাবে সাগরপথে এক কনটেইনার পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে আনতে ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়ে ২৫ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এরই মধ্যে বেড়েছে জাহাজ ভাড়া। বেড়েছে ঝুঁকি ভাতা ও বীমার হারও। সেই হিসাবে এক কনটেইনার পণ্যে বাড়তি খরচ হচ্ছে ৬৬ শতাংশ।এদিকে, হরমুজের পর বাব-আল মান্দেব প্রণালিতেও অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় সাগরপথে পণ্য পরিবহনের খরচ আরেক দফা বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে এত দিন সীমিত পরিসরে জ্বালানি পরিবহন করতে পারলেও পাল্টাপাল্টি হামলার মুখে এখন কার্যত তা বন্ধ হয়ে আছে। লোহিত সাগরে সংঘাত আরও বাড়লে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপগামী জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হবে। বাব-আল মান্দেব প্রণালি বন্ধ হলে এক কনটেইনার পণ্য আমদানি খরচ ৬৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।বাব-আল মান্দেব ব্যবহার না করে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে ঘুরে গত শনিবার চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জন্য অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে আসা জাহাজ এমটি নিমেনিয়া । পথ পরিবর্তন করে আসার কারণে এই জাহাজকে মূল ভাড়ার পাশাপাশি প্রায় ৫৪ লাখ ডলার বাড়তি গুনতে হয়েছে। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা ধরলে বাংলাদেশি টাকায় যা দাঁড়ায় প্রায় ৬৭ কোটি টাকা। এই জাহাজের মতো অন্যসব জাহাজ বাড়তি পথ ঘুরলে তাদেরও গুনতে হবে এমন অর্থ।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর পরই খরচ বাড়ার এই ঘোড়া ছুটতে থাকে। ফ্রেইট ফরোয়াডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে ২০ ফুট এককের এক কনটেইনার পণ্য আনতে আগে গড়ে এক হাজার ৪০০ ইউএস ডলার খরচ হলেও এখন লাগছে আড়াই হাজার ডলার। ২০ ফুট এককের একটি রপ্তানি কনটেইনার (গড়ে ৮ টন) বাংলাদেশ থেকে নিউইয়র্কে নিতে আগে তিন হাজার ডলার লাগলেও এখন লাগছে ছয় হাজার ডলারের বেশি। একই আকারের একটি রপ্তানি কনটেইনার বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের হামবুর্গ বন্দরে নিতে আগে আড়াই হাজার ডলার লাগলেও এখন লাগছে পাঁচ হাজার ডলারের বেশি। চীনের নিংবো বন্দর থেকে সরাসরি রুটে মায়েস্ক লাইনের একটি ২০ ফুটের কনটেইনারে পণ্য আনতে লাগত দেড় হাজার ডলার। এখন লাগছে এক হাজার ৯৫০ ডলার। জ্বালানির পাশাপাশি বীমার হার বেড়ে যাওয়ায় শিপিং লাইনগুলো আমদানিকারক থেকে এমন বাড়তি অর্থ আদায় করছে।

শুধু সাগর পথে নয়; বাড়তি খরচের ফাঁদ আছে দেশের বন্দরেও। ২০ ফুট এককের একটি আমদানি কনটেইনার বন্দরে আসার পর বাড়তি দিতে হচ্ছে পাঁচ হাজার ৭২০ টাকা। আগে ১০ হাজার ৫২৩ টাকা মাশুল দিয়ে খালাস করা গেলেও ৯ মাস আগে বর্ধিত ট্যারিফ কার্যকর করায় এখন দিতে হচ্ছে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা।ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাব-আল মান্দেব প্রণালি বন্ধ হলে এশিয়া থেকে ইউরোপের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে জাহাজের গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় (ট্রানজিট লিড টাইম) ১২ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত বাড়বে। এতে জলপথে যে খরচ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল সেটি ৪৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকতে পারে। তখন এক কনটেইনার পণ্য আমদানি খরচ ৬৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।হরমুজ ও বাব-আল মান্দেব হয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), সারসহ বিভিন্ন পণ্য আসে। প্রতি বছর জ্বালানি চাহিদার ৬০ শতাংশই পূরণ করতে হয় আমদানির মাধ্যমে। আবার চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সিংহভাগও আসে সাগরপথে। উন্নয়ন কাজে ব্যবহৃত হওয়া ইস্পাতের কাঁচামাল ও সিমেন্ট ক্লিংকারেরও বড় অংশ জাহাজে করে বিদেশ থেকে আসে। খরচ বাড়ার এই প্রভাব তাই সরাসরি পড়বে ভোক্তার কাঁধে।

জলপথে খরচ বেড়েছে ২৫ শতাংশ

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ওলটপালট হয়ে গেছে সমুদ্র বাণিজ্যের ছক। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ কবে নাগাদ যুদ্ধ শেষ হবে তা অনুমান করতে পারছেন না কেউ। অথচ মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার বাজারে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির ১৫ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। আর হরমুজ দিয়ে আসা মোট জ্বালানির প্রায় ৮৯ শতাংশই ঢোকে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বাজারে। সরবরাহ চ্যানেলে বাধা তৈরি হওয়ায় জলপথে পণ্য পরিবহনের খরচ এরই মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি প্রশাসনের (ইআইএ) তথ্য বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক তেল পরিবহন ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে ছিল দুই কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সেটি কমে নামে ৪৯ লাখ ব্যারেলে। অভিন্ন চিত্র দেখা গেছে, তেল রপ্তানি করা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও। বিশ্বজুড়ে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। যার প্রভাব পড়েছে জাহাজ ভাড়ায়।বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী জানান, হরমুজ প্রণালিতে বাধা পাওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যবোঝাই জাহাজকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ঝুঁকি বাড়াতে বীমার হার দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে। এই বীমার টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে জাহাজ মালিকদের। আমদানিকারকদের পরিশোধ করতে হচ্ছে বাড়তি জাহাজ ভাড়া। সম্ভাব্য হামলা এড়াতে অনেক জাহাজ নিরাপদ জলসীমায় অপেক্ষা করছে। কেউ কেউ ব্যয়বহুল বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছে।

সাগরপথে পণ্য পরিবহন খরচ আরও বাড়বে

বাব আল-মান্দেব প্রণালি আক্রান্ত হলে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে। কারণ, লোহিত সাগর হলো ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রধানতম সমুদ্রপথ। এই পথ ব্যাহত হলে জাহাজগুলোকে কেপ অব গুড হোপ (উত্তমাশা অন্তরীপ) হয়ে ঘুরে যেতে হবে। সে ক্ষেত্রে ইউরোপে বাংলাদেশের পণ্যের চালান পৌঁছাতে বাড়তি আরও ১৫ দিনের মতো সময় লাগতে পারে। এতে ফুয়েল চার্জ, বীমা চার্জসহ অন্যান্য খরচ যোগ হলে জাহাজ ভাড়া ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান ও ইন্ডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বলেন, হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের যে ৮০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি হয়, সেটি বড় ধাক্কা খাবে। আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারেও গার্মেন্টস পণ্য পাঠাতে আমাদের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। জাহাজ ভাড়ার খরচ আমদানিকারক বহন করলেও রপ্তানিকারক হিসেবে সেটির প্রভাব পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের ওপরও পড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বন্দরে বর্ধিত মাশুল ৪১ শতাংশ

২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২৩ খাতে পুরোদমে বর্ধিত ট্যারিফ (মাশুল) আদায় করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে খরচ বেড়ে যায় সর্বোচ্চ ৪১ শতাংশ পর্যন্ত। এটি নিয়ে ব্যবসায়ীরা আপত্তি তুলেছিলেন। তাতে কর্ণপাত করেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ।সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুসারে, সবচেয়ে বেশি মাশুল বেড়েছে কনটেইনার পরিবহন খাতে। ২০ ফুট কনটেইনারে মাশুল বেড়ে হয়েছে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা, যা আগের চেয়ে ৪ হাজার ৩৯৫ টাকা বেশি (গড়ে ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি)। আমদানি কনটেইনারে ৫ হাজার ৭২০ টাকা এবং রপ্তানি কনটেইনারে ৩ হাজার ৪৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি কনটেইনার ওঠানামায় মাশুল বেড়েছে গড়ে প্রায় তিন হাজার টাকা। জাহাজের ওয়েটিং চার্জও তখন বাড়ানো হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে ভিড়তে না পারলে ১২ ঘণ্টার জন্য ১০০ শতাংশ, ২৪ ঘণ্টার জন্য ৩০০ শতাংশ, ৩৬ ঘণ্টার জন্য ৪০০ শতাংশ আর ৩৬ ঘণ্টার বেশি হলে অতিরিক্ত ৯০০ শতাংশ চার্জ গুনতে হচ্ছে এখন।বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, প্রায় ৪০ বছর পর মাশুল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। মাশুল বাড়ানোর আগে এশিয়ার ১০টি এবং আন্তর্জাতিকভাবে ১৭টি বন্দরের কার্যক্রম ও ট্যারিফ পর্যালোচনা করা হয়েছে। এ কাজে স্পেনের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইডমেরও সহযোগিতা নেওয়া হয়েছিল।

বাড়তি খরচ অন্যভাবে তুলে নিচ্ছে শিপিং এজেন্টরা

সাগরপথে পণ্য পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জাহাজ নেই বাংলাদেশের। ১০৮টি জাহাজ থাকলেও সেগুলো প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রতুল। বছরে ২০ ফুট এককের ৩৩ লাখ কনটেইনার ওঠানামা হয় শুধু চট্টগ্রাম বন্দরেই। এ জন্য ২০টির বেশি বিদেশি শিপিং লাইন কার্যক্রম পরিচালনা করে দেশে। এর মধ্যে মায়েরস্ক একাই দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কনটেইনার পরিবহন করে। এ ছাড়া ওশেন নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস, সিএমএ সিজিএম, এমএসসি এবং হ্যাপাগ-লয়েডের মতো অন্য বড় কোম্পানিও রয়েছে। সাগরপথের বাণিজ্যে তাই প্রভাবটাও সরাসরি পড়ে বাংলাদেশে।আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের বাড়তি পরিচালন খরচ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। বিভিন্ন পথে নতুন করে জ্বালানি সারচার্জ আরোপ করেছে অনেকে।শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল বলেন, বন্দর আপত্তি করায় এ বিষয়টি শিপিং এজেন্টরা প্রকাশ্যে স্বীকার করছে না। তবে কেউ কেউ পার্টির সঙ্গে সমঝোতা করে বাড়তি অর্থ নিচ্ছে। এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে ড্রাই কার্গোর জন্য ৪০ ফুট কনটেইনারে ৩২০ ডলার বাড়তি অর্থ নেওয়া হচ্ছে। ২০ ফুট কনটেইনারে এই হার ১৬০ ডলার। আবার রেফ্রিজারেটেড কনটেইনারে এ হার আরও বেশি; সেটি যথাক্রমে ২১০ ও ৪২০ ডলার। এশিয়া, ইউরোপ এবং ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য রুটগুলোতেও একই ধরনের কৌশল নিয়েছে মেইন লাইন অপারেটররা। জ্বালানি দামের ওঠানামা এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে এভাবে খরচ সমন্বয় করতে বাধ্য হচ্ছে তারা।