NEWSTV24
বদলে গেছে বৃষ্টির ধরন, প্রস্তুতি পুরোনো ধারায়
বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:৫১ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

এবার বর্ষা মৌসুমে দুর্যোগের চরিত্র ছিল ভিন্ন। আবহাওয়ার ধারাবাহিকতাও ছিল অস্বাভাবিক। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কয়েক দিনের টানা অতিভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস ও বন্যা দেখেছে সেখানকার মানুষ। একই সময়ে উজানের বৃষ্টিতে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বেড়ে যায় নদনদীর পানি। আবার কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশের দুই বড় শহর ঢাকা ও চট্টগ্রাম অস্বাভাবিক জলাবদ্ধতার মুখে পড়ে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বন্যা মোকাবিলা নয়, বরং বদলে যাওয়া বর্ষার ধরন বুঝে উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করা। নদী, খাল ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, এলাকাভিত্তিক পূর্বাভাস এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানো কঠিন হবে।গত নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি হয়নি। এর পর তাপপ্রবাহের মাস এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়। আবার বর্ষার শুরু হিসেবে পরিচিত জুনে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হয় প্রায় ২৯ শতাংশ। একই সময়ে তিন দফায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১০ থেকে ১২ দিন তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এর পর জুলাইয়ের শুরুতে প্রকৃতি যেন পুরো উল্টো চেহারা ধারণ করে। সদ্য বিদায়ী জুলাই মাসে বৃষ্টির পরিমাণ ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৫ থেকে ১২ জুলাই মাত্র আট দিনে চট্টগ্রামে এক হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। ৭ জুলাই এক দিনেই রেকর্ড হয় ৪১২ মিলিমিটার, যা গত চার দশকের মধ্যে নগরীর সর্বোচ্চ এক দিনের বৃষ্টি। এর পর এক সপ্তাহের মাথায় ঢাকায় প্রায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতে রাজধানীর বহু এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১৯৫৩ সাল থেকে সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আট দিনের এই বৃষ্টি দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এবারের বিশেষত্ব শুধু বৃষ্টির পরিমাণ নয়, বরং এর বিস্তৃতি। জুলাই মাসে দেশে গড়ে ৬৬৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাত ৪৯১ মিলিমিটারের তুলনায় এটি প্রায় ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। ময়মনসিংহ বিভাগে বৃষ্টিপাত প্রায় স্বাভাবিক থাকলেও দেশের অন্য সব বিভাগেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিচ্যুতি দেখা গেছে খুলনা বিভাগে, যেখানে স্বাভাবিকের তুলনায় ৫৩ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রামে ১ হাজার ৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ৫১ শতাংশ বেশি। সিলেটে ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ঢাকায় ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বরিশালে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অধিকাংশ বিভাগেই বৃষ্টির দিনের সংখ্যাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল।আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, আট দিনে বান্দরবানে এক হাজার ১০২ মিলিমিটার, কক্সবাজারে ৮৪৬ মিলিমিটার, সন্দ্বীপে ৭৬৮ মিলিমিটার, সীতাকুণ্ডে ৬৭৬ মিলিমিটার এবং রাঙামাটিতে ৬৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। কুতুবদিয়ায় আট দিনের তথ্য না থাকলেও সাত দিনেই প্রায় এক হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।আবহাওয়াবিদরা বলছেন, দেশের এক দিনের বৃষ্টির রেকর্ড হয়েছিল ২০০১ সালের ১৪ জুন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে, ৫৯০ মিলিমিটার। তবে সেবার প্রবল বর্ষণ একটি সীমিত এলাকায় ছিল। এবার কোনো এক দিনে ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি খুব বেশি জায়গায় না হলেও পুরো দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল কয়েক দিন ধরে একই ধরনের অতিভারী বর্ষণের মধ্যে ছিল। ফলে ভৌগোলিক বিস্তারের দিক থেকে এবারের ঘটনা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু সাত জেলার বন্যা নয়; বরং বন্যার চরিত্রের বদল। আগে বর্ষাকালে নদীর পানি বেড়ে যাওয়া ও উজানের ঢল ছিল প্রধান উদ্বেগ। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নগর বন্যা ও পাহাড়ি ঢল। তারা মনে করেন, নদী-বন্যার পাশাপাশি নগর-বন্যা ও পাহাড়ি ঢল এখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। তাই শুধু পূর্বাভাস দিলেই হবে না, সেই পূর্বাভাসের ভিত্তিতে নগর ড্রেনেজ, খাল পুনরুদ্ধার, জলাভূমি সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, এখন আর শুধু কত মিলিমিটার বৃষ্টি হলো তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং কখন, কোথায় এবং কত অল্প সময়ে সেই বৃষ্টি হচ্ছে, সেটিই নতুন বাস্তবতা।বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, দেশে সাধারণত তিন ধরনের বন্যা দেখা দেয় নদীর পানি উপচে পড়ে, পাহাড়ি ঢলে আর নগর-বন্যা। এবার কমবেশি তিন ধরনের পরিস্থিতিই একই সঙ্গে দেখা গেছে।চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল বলে মনে করেন তিনি। কর্ণফুলী নদীতে জোয়ারের সময় অনেক ক্ষেত্রে স্লুইসগেট বন্ধ রাখতে হয়। তখন কার্যকর পাম্পিং ব্যবস্থা না থাকলে শহরের পানি দ্রুত নামানো সম্ভব হয় না। অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, এখন এলাকাভিত্তিক বন্যার পূর্বাভাস এবং নগর বন্যার আলাদা পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালুর সময় এসেছে।