ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর লক্ষ্যে একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে ইরানি ও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চুক্তিটি কার্যকর হলে বিশ্বের অন্যতম কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এত এই নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে। একই সঙ্গে, বৈশ্বিক জ্বালানি করিডোর ব্যবস্থাপনায় ইরানের কেন্দ্রীয় ভূমিকার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মিলবে, যা যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতির তুলনায় তেহরানের প্রভাব আরও সুসংহত হবে। আলোচনার বিষয়ে অবগত ইরানি ও মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার অধীনে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজ ইরানের উপকূলসংলগ্ন একটি নৌপথ ব্যবহার করবে, যা ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। অন্যদিকে, উপসাগর থেকে বেরিয়ে যাওয়া জাহাজ ওমানের উপকূলঘেঁষা পথ ব্যবহার করবে। ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, কোনো টোল আরোপ করা হবে না। তবে পরিবেশ সংরক্ষণ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, মালবাহী ও তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা এবং পরিচালনাগত ব্যয় মেটাতে একটি পরিষেবা মাসোহারা নেওয়া হবে। দুইজন ইরানি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ থেকে প্রাপ্ত আয় ইরান ও ওমান সমানভাবে ভাগ করে নেবে।
তবে, ইরানি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, পারস্য উপসাগরে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর ওয়াশিংটনের নৌ অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত এবং উভয় দেশ ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে বর্ণিত ১৪-দফা কাঠামোতে ফিরে না আসা পর্যন্ত এই জলপথ বন্ধ থাকবে।
কিছু কর্মকর্তা আরও বলছেন যে, ইরানি তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলে তা বাজারকে আরও স্থিতিশীল করতে পারে। তারা বলেছেন, প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থাটি প্রণালীটির তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে তেহরানের সক্ষমতাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে, যা সংঘাতের সময় অর্জিত কৌশলগত সুবিধাকে অক্ষুণœ রাখবে।
এই উদীয়মান চুক্তিটি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সেই অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে তিনি আমেরিকা-ইসরায়েলের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান আক্রমণের আগের মতো উন্মুক্ত নৌপথ পুন:প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ট্রাম্প এ বিষয়ে প্রকাশ্যে খুব সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, নতুন করে আলোচনায় ফেরার প্রেক্ষাপটেই তিনি সপ্তাহান্তে ইরানের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সামরিক হামলার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন।
সম্ভাব্য চুক্তি অনুযায়ী, ইরান ও ওমান কার্যপ্রণালীর খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করার জন্য ৬০ দিন সময় পাবে। একই সময়ে, একই সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান ইরানের ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ, যার মধ্যে প্রায় অর্ধ টন অস্ত্র-উপযোগী মাত্রার কাছাকাছি, তা নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করবে।
যদিও জুনের মাঝামাঝিতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পরে ট্রাম্প স্বাক্ষরিত একটি পরিকল্পনায় ৬০ দিনের মধ্যে একটি পারমাণবিক চুক্তির কথা বলা হয়েছিল, তবে মার্কিন কর্মকর্তারা এখন স্বীকার করছেন যে আলোচনা শরৎকাল পর্যন্ত চলতে পারে। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদিত হবে কি না।
পেন্টাগনের ভেতরে কিছু কর্মকর্তা এই ব্যবস্থাকে কৌশলগত ছাড় হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, মাইন-আচ্ছাদিত জলপথ এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার কারণে নিরাপদ নৌযাত্রার জন্য তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যদিকে কিছু ইরানি কর্মকর্তাও প্রশ্ন তুলেছেন, এই চুক্তি ভবিষ্যতে আমেরিকার নতুন সামরিক হামলার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারবে কি না।
ইরানের প্রধান আলোচকের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মাদি সোমবার রাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, হরমুজ প্রণালি পরিচালনার জন্য ইরান ও ওমান একটি পৃথক কাঠামো নিয়ে আলোচনা করছে, যা আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধের বিষয় থেকে আলাদা। তিনি আরও বলেন, ওমান-সংলগ্ন দক্ষিণ দিকের পথ দিয়ে জাহাজ পরিচালনার নির্দেশ দিয়ে ওয়শিংটন আগের শান্তি পরিকল্পনা লঙ্ঘন করেছে বলে ইরান মনে করে।
এদিকে, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির উপ-পরিচালক আলি ভায়েজ বলেছেন, ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর তার প্রভাব ধরে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, কারণ তারা এটিকে যুদ্ধ থেকে অর্জিত তাদের প্রধান কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখে এবং ওমানের সঙ্গে এই চুক্তি তেহরানকে সাম্প্রতিক লড়াইয়ের আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে।
আলি আরও বলেন, ‘যে কোনো সমাধান যা প্রণালীটির নিয়ন্ত্রণে ইরানকে রাখবে, তা ট্রাম্পের জন্য মেনে নেওয়া খুব কঠিন হবে, কিন্তু প্রণালীটির ওপর থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে দেওয়ার কোনো সামরিক সমাধানও নেই। ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা আছে: একটি এমন যুদ্ধ যা জেতা সম্ভব নয়, অথবা এমন একটি শান্তি যা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর।’