জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সারা দেশে এ পর্যন্ত ৭৯৯টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ১০০টি মামলার তদন্ত শেষ করেছে পুলিশ। তদন্ত শেষে ৬৩টি হত্যা মামলায় ৫ হাজার ৭৯৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। তবে ৩৭টি হত্যা মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তারা এফআরটি (ফাইনাল রিপোর্ট ট্রু/চূড়ান্ত প্রতিবেদন সত্য) জমা দিয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের মেন্টর কমিটি সূত্রে জানা গেছে, এসব ৩৭টি মামলায় তদন্তে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের মতো পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই তদন্তকারী কর্মকর্তারা আদালতে এফআরটি জমা দেন।
এফআরটির অর্থ হলো—ঘটনা সত্য, কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তদন্তে তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি।
এতগুলো হত্যা মামলায় এফআরটি দেওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সংঘটিত জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডের বিচার ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আইনি প্রেক্ষাপট
১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (পিআরবি)-এর ২৭৫ ধারা এবং ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ১৬৯ ধারা অনুযায়ী, পর্যাপ্ত প্রমাণ না পেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেন।
এ ছাড়া পিআরবির ২৭৬ ধারা অনুযায়ী, একজন ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের প্রতিবেদন গ্রহণ করতে পারেন। আবার সিআরপিসির ১৫৬(৩) ধারা অনুযায়ী পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন অথবা ১৯০(বি) ধারা অনুযায়ী অপরাধের বিষয়ে আমলে নিতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া
মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, অনেক মামলাই শুরু থেকেই যথাযথভাবে প্রস্তুত করা হয়নি।
তার ভাষায়, “জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংক্রান্ত মামলাগুলো সঠিকভাবে দায়ের করা হয়নি এবং যথাযথ সাক্ষী ছাড়াই আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ইচ্ছাকৃতভাবে জড়ানো হয়েছে। ফলে প্রমাণের অভাবে পুলিশ ৩৭টি হত্যা মামলায় এফআরটি জমা দিয়েছে।”
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইস্তিয়াক আহমেদ বলেন, বিভিন্ন কারণে এফআরটি দাখিল হতে পারে। কখনো যথাযথ তদন্তের অভাবে, কখনো অভিযুক্তের সঙ্গে সমঝোতার পর, আবার কখনো আইন অনুযায়ী তদন্ত শেষে এমন সিদ্ধান্ত আসে।
তিনি বলেন, বাদী, অভিযোগকারী বা প্রসিকিউটর চাইলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে এসব মামলার পুনঃতদন্ত বা পুনরুজ্জীবনের সুযোগ রয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, তদন্ত আরও গভীর ও বিস্তৃত হওয়া উচিত ছিল। তার ভাষ্য, হত্যাকাণ্ড যেহেতু ঘটেছে, তাই প্রকৃত অপরাধীও রয়েছে। কিন্তু তাদের শনাক্ত করা না গেলে তারা আইনের আওতার বাইরে থেকে যাবে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে।
পুলিশের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, তদন্তের ফলাফল অনেক ক্ষেত্রেই মামলার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছে।
তিনি জানান, বেশ কয়েকটি ঘটনায় একই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছিল। তদন্তে দেখা গেছে, অনেক অভিযুক্ত ওই ঘটনায় জড়িত ছিলেন না। সে কারণেই এসব মামলায় এফআরটি দেওয়া হয়েছে।