ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে চলমান পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ব্যাংকটির আমানতকারীরা যেকোনো সময় তাদের টাকা তুলতে পারবেন। তাদের কোনো অসুবিধা হবে না। ব্যাংকটির জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে এবং বিদ্যমান নিয়ম-কানুন প্রয়োগ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে।বৃহস্পতিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন গভর্নর। অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে চলা আন্দোলনের মধ্যে গত কয়েক দিনে আমানতকারীরা সাত হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত তুলে নিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা চেয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গত সপ্তাহে গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করে উদ্বেগ জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংকে অবৈধ হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ একটি গোষ্ঠী করছে, তা সঠিক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ঋণ অনুমোদন, নিয়োগ, বদলি বা পদোন্নতির বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেনি।ব্যাংক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে গভর্নর বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের এক-তৃতীয়াংশ অর্থ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে বের হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে খাতটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সময় ও সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে জমে থাকা সমস্যাগুলোর সমাধান হবে। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যারা দীর্ঘদিন ধরে অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না, তাদের অর্থও আগামী এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।মোস্তাকুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাত থেকে প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা বের হয়ে গেছে। এই অর্থের একটি অংশ সাধারণ মানুষ ব্যাংকে জমা রেখেছিলেন, যা পরে বিভিন্নভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এখন সেই অর্থ পুরোপুরি সরকারি রাজস্ব থেকে ফিরিয়ে দেওয়া কতটা সম্ভব, তা নিয়েও বাস্তবতা বিবেচনা করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারের সক্ষমতার বিষয়ও রয়েছে। এ কারণে আপাতত ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঘোষিত স্কিম অনুযায়ী অর্থ পরিশোধের কাজ চলছে।বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে গভর্নর বলেন, এ কাজ অত্যন্ত জটিল। আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের অর্থ উদ্ধারের সফলতার হার ২ শতাংশেরও কম। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বসে নেই। বিভিন্ন দেশে অর্থ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং অন্তত ১০টি সংস্থা এ বিষয়ে কাজ করছে। ইতিমধ্যে কিছু অর্থ করের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার একটি প্রাথমিক সাফল্যও পাওয়া গেছে।গভর্নর বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। কখনো বলা হয়েছে, পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ ব্যাংক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে এবং সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত পাঁচ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের একজন পরিচালককে অভিযোগের ভিত্তিতে অপসারণ করা হয়েছিল। পরে ঈদের আগে আন্দোলনের মুখে তৎকালীন চেয়ারম্যান পদত্যাগ করলে দ্রুত নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে হয়। এরপর থেকেই একটি পক্ষ ব্যাংকটিকে অস্থির করার চেষ্টা করছে বলে তাঁর দাবি।
তারল্য পরিস্থিতি নিয়ে গভর্নর বলেন, সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে কোনো তারল্যসংকট নেই। কিছু ব্যাংকে আগে থেকে থাকা সমস্যাগুলোর বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইসলামী ব্যাংকের সমস্যাও সমাধান করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।নিজের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ প্রসঙ্গে মোস্তাকুর রহমান বলেন, গত চার মাস ধরে এ ধরনের অভিযোগ বারবার শোনা যাচ্ছে। তবে তিনি এ বিষয়ে আগে ব্যাখ্যা দেননি। তার ভাষ্য, তিনি যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেটি একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি কখনো ঋণ মওকুফ চায়নি এবং ঋণ পরিশোধে বিলম্বের পেছনে বিশেষ পরিস্থিতি কাজ করেছে।তিনি বলেন, একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক-সমর্থিত প্রকল্পের আওতায় কম সুদে ঋণ নেওয়ার পর হঠাৎ সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধে কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পরিশোধ করেছে।