NEWSTV24
তাপদাহের বহুমুখী প্রভাব, প্রস্তুতি কম
বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬ ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে তাপপ্রবাহ, খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত। সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো এই চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ইতোমধ্যে দেশে একের পর এক জেলায় তাপপ্রবাহ শুরু হচ্ছে।চলতি জুনের শুরুতেই রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চলসহ দেশের ৪০টি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ শুরু হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী কয়েক দিন এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। এর মধ্যেই বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করেছে, চলতি বছরের শেষার্ধে শক্তিশালী এল নিনো সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা বেশি।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, পানিসম্পদ, জনস্বাস্থ্য এবং শ্রমনির্ভর জীবনযাত্রা সরাসরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হলে বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি, খরা, ফসলহানি, পানিসংকট এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এখনই তাপপ্রবাহকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং জলবায়ুসহিষ্ণু অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এর অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য আরও বেশি হতে পারে।

তাপমাত্রা উঠতে পারে ৪০ ডিগ্রিতে

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুরসহ দেশের ৪০টি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে নীলফামারীর সৈয়দপুরে, ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।আবহাওয়াবিদ মো. শাহিনুল ইসলাম বলেন, এ সময় তাপপ্রবাহ অস্বাভাবিক নয়। তবে আগামী কয়েক দিনে তা আরও বিস্তৃত হতে পারে। বৃষ্টিপাত না হলে তাপমাত্রা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, জুন মাসে দুই থেকে তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে। কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের প্রকৃতি দ্রুত বদলে গেছে। আগে যেখানে কয়েক দিনের জন্য তাপমাত্রা বাড়ত, এখন সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে তাপদাহ থাকছে। রাতের তাপমাত্রাও আগের মতো কমছে না। ফলে মানুষের শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাচ্ছে না।

বাংলাদেশে সাধারণত জুন মাসে বর্ষা শুরু হয়। কৃষিকাজ, নদনদীর প্রবাহ, ভূগর্ভে পানির প্রতিস্থাপনসহ সবকিছুই এই মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে, চলতি জুনে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হতে পারে। সাধারণত জুন মাসে দেশে গড়ে ৪৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এটি বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের মাস। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় জুলাইয়ে। তবে এবার বৃষ্টিপাত কম হলে কৃষি, পানিসম্পদ ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় ভূগর্ভের পানির ওপর নির্ভর করে কৃষি উৎপাদন হয়, সেসব এলাকায় সেচ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

নতুন বৈশ্বিক সতর্কবার্তা এল নিনো

দেশের অভ্যন্তরীণ আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে এল নিনো। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের আগেই এল নিনো তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৮০ শতাংশ। নভেম্বরের আগে এই আশঙ্কা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের অস্বাভাবিক উষ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জলবায়ুগত ঘটনা। এটি পৃথিবীর বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রার স্বাভাবিক ভারসাম্য পরিবর্তন করে দেয়। ফলে বিশ্বের এক অংশে ভয়াবহ খরা দেখা দেয়, অন্য অংশে অতিবৃষ্টি ও বন্যা হয়। কোথাও দীর্ঘ তাপপ্রবাহ বয়ে যায়, কোথাও আবার অস্বাভাবিক ঝড়ের প্রকোপ বাড়ে।জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে বৈশ্বিক জলবায়ুর জন্য জরুরি সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এল নিনো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেছেন, বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলে আগামী কয়েক মাস স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে। বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে এল নিনো বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাব বাংলাদেশের ওপর সরাসরি নয়, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এল নিনো সক্রিয় হলে বাংলাদেশের বর্ষা বিলম্বিত হতে পারে। একই সঙ্গে মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রার পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার বৃষ্টিপাতের ধরনেও প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো খরা ও তাপপ্রবাহ। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রামসহ উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এমনিতেই দেশের খরাপ্রবণ এলাকা। এসব অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গেলে দ্রুত পানির সংকট দেখা দেয়। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে কৃষককে সেচের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ে। একই সঙ্গে ভূগর্ভে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যায়।বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তাপপ্রবাহের ভয়াবহতা দেখেছে। ২০২৪ সালে দেশের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ তাপপ্রবাহ দেখা যায়। টানা ৩৬ দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করে। চুয়াডাঙ্গা, যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, ময়মনসিংহসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল অস্বাভাবিক তাপদাহে আক্রান্ত হয়েছিল। সেই সময়ে স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছিল। হাসপাতালে হিটস্ট্রোক ও পানিশূন্যতার রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক এবং নিম্ন আয়ের মানুষ।আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হলে আগামী বছরগুলোতে আরও দীর্ঘ ও ঘনঘন তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।