NEWSTV24
সমন্বয়হীনতায় কমছে না হামের প্রকোপ
রবিবার, ২৪ মে ২০২৬ ১১:০০ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

দেশে হাম ও হামের উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৬৯ দিনে ৫০০ ছাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেছিলেন, চলতি মাসের শেষ দিকে সংক্রমণের হার কিছুটা কমে আসতে পারে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে সেই লক্ষণ এখনও স্পষ্ট নয়। বরং সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি ও কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিলম্ব হচ্ছে।তাদের মতে, শুরু থেকেই রোগ নিয়ন্ত্রণে আরও দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতো। টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি এবং দ্রুত শনাক্তকরণ ব্যবস্থার ঘাটতি বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের ব্যাপক চলাচল সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে যাতায়াত ও জনসমাগম বাড়লে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখনই সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।এদিকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদ। তিনি বলেন, হামে মৃত্যুর হার কমাতে কার্যকর সর্বাত্মক উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়; বরং বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৩টি শিশু মারা যাচ্ছে। বিষয়টিকে যেন স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, আমাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, আমরা যেন হামে মৃত্যু কমাতে চাইছি না। সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে অনেকেই হামের পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আছে বা সংক্রমণ কমে আসছে বলে মন্তব্য করছেন, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।তাঁর মতে, এ ধরনের বক্তব্য পরিস্থিতির গুরুত্ব কমিয়ে দেয় এবং মৃত্যু কমানোর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। হামে মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনতে হলে পরিস্থিতিকে যুদ্ধকালীন অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। এজন্য দ্রুত আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধা বাড়ানো, হাসপাতালে অতিরিক্ত বেড ও বিশেষায়িত ওয়ার্ড চালু করা এবং বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করা জরুরি ছিল। চিকিৎসা ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধান করতে হতো। শুরু থেকেই সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে অনেক কম মৃত্যুর মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব ছিল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, প্রতিটি মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে একাধিক বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে ডেথ অডিট পরিচালনা করতে হবে। কেন মৃত্যু হচ্ছে, কোথায় ব্যর্থতা বা ঘাটতি রয়েছে এসব নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরতে হবে। ভয় বা সংকোচ না রেখে বাস্তবতা প্রকাশ করতে হবে। হামকে মহামারি ঘোষণা করার পক্ষেও মত দেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, মহামারি ঘোষণা করা হলে সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পেত, যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক হতো।তিনি আরও বলেন, মহামারি ঘোষণা করলে অতিরিক্ত বরাদ্দ পাওয়া, চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ এবং আইসিইউ সক্ষমতা বাড়ানো সহজ হতো। এসব বিষয়ে গুরুত্ব না দেওয়া দুঃখজনক। এখনই গুরুত্ব না দিলে মৃত্যুহার আরও বাড়তে পারে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হাম ও হামের জটিলতায় মারা গেছে ৫১২ শিশু। এর মধ্যে ৮৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামে। বাকি ৪২৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। এই ভাইরাস ও এর উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৬২ হাজার ৫০৭ জন।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, এক দিনে নতুন করে ১ হাজার ৯৬৭ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। মারা যাওয়া ১৩ শিশুর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে হামে, বাকি ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে।হামে বরিশালে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামের উপসর্গে ঢাকায় চার, চট্টগ্রামে দুই, সিলেটে চার, বরিশালে এক এবং ময়মনসিংহে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে সারা দেশে মোট ৬২ হাজার ৫০৭ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৮৯ শিশু। তবে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪৫ হাজার ১১ জন।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি প্রাদুর্ভাবে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এই বিভাগে এ পর্যন্ত ২০ হাজার ৯২৩ জন চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ২১৪ শিশু। ঢাকার পর সংক্রমণ ও মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ। সেখানে ৪ হাজার ৮৪৪ জন চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৮১ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায় ৯ হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছে এবং মারা গেছে ৫২ জন। সিলেট বিভাগে ২ হাজার ৭২৫ জন আক্রান্তের মধ্যে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বরিশাল বিভাগে ৪ হাজার ৬১৬ জন চিকিৎসা নিয়েছে, মারা গেছে ৫০ শিশু। ময়মনসিংহে ২ হাজার ২৫৫ জন আক্রান্তের মধ্যে ৩৭ জন মারা গেছে। খুলনা বিভাগে ৪ হাজার ২৫৪ জন চিকিৎসা নিয়েছে, সেখানে মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের। এ ছাড়া রংপুর বিভাগে ৫৫০ জন আক্রান্তের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন, মেক্সিকো, অ্যাঙ্গোলা, কাজাখস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ক্যামেরুনসহ অনেক দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো উন্নত দেশেও হাম ফিরে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে মৃত্যুর সংখ্যার আধিক্যের কারণে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশকে ঘিরে। দেশে হামে মৃত্যুহার এখন শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ। এটি বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।হামের চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত একাধিক চিকিৎসক বলছেন, মৃত্যুহার বেশি হওয়ার কারণের মধ্যে রয়েছে নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি, দীর্ঘদিন এমআর (হাম-রুবেলা) ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা, শিশুদের অপুষ্টি, দেরিতে হাসপাতালে আসা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী অপুষ্ট শিশুরা হামের জটিলতায় দ্রুত নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট ও মস্তিষ্কের প্রদাহে আক্রান্ত হচ্ছে।