জ্বালানি তেলের সংকটে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর অবশেষে সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আজ থেকে সারাদেশে অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। একই দিন একই সঙ্গে বাড়ছে দামও। সংস্থাটি আশা করছে, এর ফলে পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা এবং অঘোষিত রেশনিংয়ের মতো সমস্যা কিছুটা হলেও কমে আসবে।গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানীসহ সারাদেশের পেট্রলপাম্পগুলোয় জ্বালানি তেল নিতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন চালকরা। কোথাও এক থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ির লাইন, কোথাও আবার তিন-চার ঘণ্টা অপেক্ষার পরও পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে রেশনিং তুলে নিলেও বাস্তবে সীমিত সরবরাহের কারণে অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ থেকেই গেছে। এই অবস্থায় বিপিসি জানিয়েছে, আজ রবিবার থেকে অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ এবং পেট্রল ও ডিজেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ করে বাড়ানো হবে। সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গত বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসের বিক্রিকে ভিত্তি ধরা হয়েছে, যাতে কৃত্রিম চাহিদা ও মজুদদারির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ডিলার ও পাম্পভিত্তিক তালিকা অনুসারে এই বাড়তি তেল বণ্টন করা হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানিতেও গতি আনা হয়েছে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজ তেল খালাস করেছে, আরও ২১টি জাহাজ সমুদ্রপথে রয়েছে এবং অন্তত ৪টি জাহাজ খালাসের অপেক্ষায় আছে। সামনে আরও বড় পরিসরে তেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যেন সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা যায় এবং বাজারে চাপ কমে।সারাদেশের যেসব পেট্রলপাম্পে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়, সেখানে প্রায় সারাক্ষণ মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার এবং অন্যান্য গাড়ির ভিড় লেগেই আছে। তেল প্রাপ্তি নিয়ে মানুষের ভোগান্তি ও হয়রানির অভিযোগ অন্তহীন। তিন-চার লিটার জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে গাড়ির ড্রাইভারদের তিন চার ঘণ্টা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি সময় লাগছে বলে অভিযোগ আছে। রাজধানীর আশপাশের অনেকগুলো পাম্পে গতকাল সারাদিন ঘুরে দেখা গেছে, তেল সংগ্রহ করতে প্রায় এক, দুই কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ির লম্বা লাইন। সরকার কাগজে-কলমে রেশনিং তুলে নিলেও কার্যত অঘোষিত রেশনিং আছে জ্বালানি তেল বিক্রিতে।
গত বছরের মার্চ-এপ্রিলে জ্বালানি তেল বিক্রিকে কেন চলতি বছর ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে জানতে চাইলে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, এটা মূলত যুদ্ধের কারণে করতে হয়েছে। এক বছরের মধ্যে কোনো ডিলার বা ক্রেতার নিশ্চয়ই ডাবল চাহিদা তৈরি হবে না। জ্বালানি তেলের বিশ্বব্যাপী সংকট তৈরি হওয়ার পর দেখা গেছে, কোনো কোনো ডিলার বা ক্রেতা দ্বিগুণ, তিনগুণ জ্বালানি তেলের চাহিদাপত্র দিচ্ছে। এগুলো মূলত মুজদদারির আশায়। ফলে আমরা বিগত বছরের কোন মাসে কত তেল কোন ক্রেতা কিনেছে সেগুলো বিবেচনা করে তেল সরবরাহ দিচ্ছি, যাতে মানুষের মধ্যে যে প্রবল মজুদের চিন্তা সেটা রুখে দেওয়া যায়।এদিকে গতকাল পর্যন্ত বিপিসির এক হিসাবে দেখা যায়, তাদের কাছে ডিজেল মজুদ আছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৮৪ মেট্রিক টন, যা দিয়ে দেশের মোট চাহিদার ৯ দিন চলবে। অকটেনের মজুদ ২৯ হাজার ৪৮৪ মেট্রিক টন, যা দিয়ে ২৫ দিনের চাহিদা পূরণ হবে। ১৮ হাজার ৮৩০ মেট্রিক টন পেট্রলে মিটবে ১৪ দিনের চাহিদা। ফার্নেস অয়েলের ৩১ দিনের মুজদ আছে ৭০ হাজার ২২০ মেট্রিক টন, জেট ফুয়েলের মজুদ ২৪ হাজার ৯৮৭ মেট্রিক টন, যা দিয়ে চলবে ১৭ দিন। এ ছাড়া কেরোসিনের মজুদ আছে ৩৬ দিনের; মেরিন ফুয়েলের মজুদ আছে এক হাজার ১০২ মেট্রিক টন, যা দিয়ে ৩২ দিনের চাহিদা মিটবে। বিপিসি বলছে, গত বছরের এপ্রিলজুড়ে ডিজেলে গড় বিক্রয় ছিল ১১ হাজার ৮৬২ মেট্রিক টন, অকটেন এক হাজার ১৮৫ মেট্রিক টন, পেট্রল এক হাজার ৩৭৪ মেট্রিক টন, ফার্নেস অয়েল দুই হাজার ২৬৩ মেট্রিক টন, জেট ফুয়েল এক হাজার ৫০০ মেট্রিক টন, কেরোসিন ১৯৪ মেট্রিক টন, মেরিন ফুয়েল ৩৪ মেট্রিক টন। সেই হিসাবে এপ্রিলে অকটেন, ডিজেল এবং পেট্রল চলতি এপ্রিলে গড়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশের সরবরাহ বাড়ানো হবে।