আমাদের মাথার ওপর ডেমোক্লেসের তরবারি ঝুলছে। একদিনের রাজা ডেমোক্লেস সম্পর্কে অনেকেরই জানা থাকার কথা। গ্রিক পুরাণের এক চরিত্র। সিসিলি দ্বীপের রাজা ডিওনিসিয়াস তাকে একদিনের জন্য মসনদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেদিন সিংহাসনে বসেই চারপাশে সুস্বাদু খাবার, দাসদাসী, সুর ও জাঁকজমকের ছড়াছড়ি দেখে বেজায় খুশি হয়েছিলেন এই সভাসদ। তিনি যখন এই বিলাসী জীবন উপভোগ করতে শুরু করেছেন, ঠিক তখনই তার চোখ গেল উপরের দিকে। তিনি ভয়ে শিউরে উঠলেন। দেখলেন, ঠিক তার মাথার উপরে ছাদ থেকে একটি ভীষণ ধারালো তরবারি নিচের দিকে মুখ করে ঝুলছে। সেও আবার বাঁধা রয়েছে ঘোড়ার লেজের মাত্র একটি সরু চুল দিয়ে! যে কোনো মুহূর্তে চুলটি ছিঁড়ে তরবারিটি তার মাথার ওপর পড়তে পারে। ভয়ে ডেমোক্লেসের হাত-পা জমে গেল। তার আর কোনো খাবার বা ঐশ্বর্য ভালো লাগল না। তিনি রাজার কাছে গিয়ে মিনতি করে বললেন, আমাকে ক্ষমা করুন, আমার এই রাজত্ব আর সুখের কোনো দরকার নেই। আমাকে বাঁচতে দিন।ঠিক তেমনি, এই মুহূর্তে সুতোর ওপর ঝুলছে এক ধারালো খড়্গ, যার ঠিক নিচেই বসে আছে আধুনিক মানবসভ্যতা। ডেমোক্লেসের তরবারির মতোই আজ গোটা বিশ্বের মাথার ওপর দুলছে এক মহাবিপর্যয়ের খাঁড়া। আর তা ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা ও বেআইনি সামরিক আগ্রাসনের কারণে। এই আগ্রাসনের আঁচ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের শুষ্ক মরুভূমিতেই সীমাবদ্ধ নেই। এই যুদ্ধ এমন এক ভয়ংকর ধারাবাহিক বিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, যা আধুনিক বিশ্বব্যবস্থাকে খাদের একেবারে কিনারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ কার্যত অচল হয়ে পড়ায় জ্বালানি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে এক অকল্পনীয় ধস নেমেছে।বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই যুদ্ধ যদি আজ, এই মুহূর্তেই থেমে যায়, তার পরও বিশ্ব অর্থনীতিকে যে ক্ষত বয়ে বেড়াতে হবে তা অপূরণীয়। আর যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়? তবে পরিস্থিতি ১৯?৭০-এর দশকের সেই ভয়ংকর মহামন্দাকেও ছাড়িয়ে যাবে।বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে ফুটে উঠছে এই বহুমুখী মহাবিপর্যয়ের রোমহর্ষক চিত্র। আল জাজিরা, বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, এনবিসি নিউজ ও সিএনএনের মতো গণমাধ্যম এবং গবেষকদের বাতায়ন দ্য কনভারসেশনের বেশ কয়েকটি প্রবন্ধের ওপর ভিত্তি করে ইরান যুদ্ধের অনিবার্য প্রভাব এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।সব সংকটের মূলে তেল সংকট : যুদ্ধে সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও কৌশলগত একটি অস্ত্র ইরানকে এখনও এগিয়ে রেখেছে। বিশ্ব অর্থনীতির শিরা-উপশিরায় রক্ত সরবরাহকারী এক বিশাল ধমনী হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের ২৭ শতাংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ২০ শতাংশ ও বৈশ্বিক সারের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। এই পথ বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিমেষেই প্রায় এক-পঞ্চমাংশ উধাও হয়ে গেছে।
তবে জ্বালানির এই সংকট এখন আর শুধু পাম্পের তেলের মধ্যেই আটকে নেই, এটি মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দৈনন্দিন ব্যবহার্য সব পণ্যের সংকটে। পেট্রোলিয়ামের উপজাত ন্যাপথার অভাবে প্লাস্টিক, রাবার ও পলিয়েস্টার উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এশিয়ায় প্লাস্টিক রেজিনের দাম ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে রেকর্ড ছুঁয়েছে। এর প্রভাব এতটাই গভীরে যে, জাপানে কিডনি ডায়ালাইসিসের জন্য প্রয়োজনীয় প্লাস্টিক টিউবের অভাব দেখা দিয়েছে, মালয়েশিয়ায় চিকিৎসায় ব্যবহৃত রাবার গ্লাভস তৈরি হুমকির মুখে পড়েছে।পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দেজান শিরা অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের বিজনেস ইন্টেলিজেন্সের অন্যতম প্রধান কর্মকর্তা ড্যান মার্টিন পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, এই সংকট খুব, খুবই দ্রুত সবকিছুর ওপর গিয়ে পড়ছে : বিয়ার, নুডলস, চিপস, খেলনা, এমনকি প্রসাধনসামগ্রীর ওপরও। তেল ও জাহাজ চলাচলের এই বিঘ্ন খুব দ্রুত পেট্রোকেমিক্যাল ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে আঘাত হানছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে নানাভাবে রূপ দিতে পারে, তবে এর প্রতিটি পথই শেষ পর্যন্ত উচ্চমূল্য এবং মন্থর প্রবৃদ্ধির দিকে যাচ্ছে।অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি : জ্বালানির এই প্রবল ঘাটতি বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অতল গহ্বরের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) জ্যেষ্ঠ ফেলো ব্র্যাড সেটসার সতর্ক করে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ব্যারেল তেল বাজার থেকে হারিয়ে যাবে। তিনি বলেন, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৭০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে (যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল ৭০ ডলার)।